• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের খোঁজে দিল্লির আঙিনায় ঢাকা ও কাঠমাণ্ডু

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য যে কত দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে পারে, তার এক অনন্য ও বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে

সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের খোঁজে দিল্লির আঙিনায় ঢাকা ও কাঠমাণ্ডু

pic-ai

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য যে কত দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে পারে, তার এক অনন্য ও বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে বর্তমানে দিল্লিকেন্দ্রিক ভারতের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দুরকম কূটনীতি। একদিকে যেখানে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের শীতল বা অমীমাংসিত সম্পর্কের বরফ গলে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক বিপরীতভাবে, অপর একটি বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র। এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরন্তন নিয়ম মেনেই ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সম্পর্ক কখনওই কোনও চিরস্থায়ী ছকে বাঁধা নয়, বরং সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক
স্বার্থের প্রয়োজনে তা পরিবর্তিত হয়ে নতুন কৌশলের রূপ নেয়।
সম্প্রতি দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সমীকরণে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্রে গভীর কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। ভারতের এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান একদিকে যেমন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ, ঠিক অন্যদিকে তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে রাখার ক্ষেত্রে ভারতের কাছে এক নতুন পরীক্ষাও বটে।
একদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি সফর করছেন না, যাকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা ঢাকার পক্ষ থেকে এক ধরনের সময়োপযোগী প্রস্তুতি বজায় রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, ঠিক একই সময়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারতের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সাগ্রহে দিল্লিতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এক প্রতিবেশীর ভারত সফর স্থগিত থাকা এবং অন্য প্রতিবেশীর ভারতে আগমনের প্রস্তুতি— ভারতের প্রতি বাংলাদেশ ও নেপালের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও ভিন্নমুখী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।
তবে দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত পরিস্থিতিটি তৈরি হয়েছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়, তখন থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাউথ ব্লকে নানামুখী হিসাব-নিকাশ চলছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পর, ভারত কালবিলম্ব না করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলাতে তৎপর হয়। নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে দিল্লির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে দ্বিপাক্ষিক সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ। এমনকি বহুপাক্ষিক স্তরে সংযোগ বাড়াতে বিমসটেকের চেয়ার রাষ্ট্র হিসেবে ঢাকাকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
তবে ভারতের এই আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ঢাকার প্রতিক্রিয়াকে দিল্লিতে ফলপ্রসূ এজেন্ডা তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে জানায় যে, এই মুহূর্তে ভ্রমণের জন্য ‘টাইমিং কনডুসিভ’ বা পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূল নয়। নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে ঢাকার এই সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে ফলপ্রসূ এজেন্ডা তৈরির প্রস্তুতি হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামলানো এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নিজস্ব শর্ত জুড়ে দেওয়ার এই নতুন ঢাকামুখী নীতিকে ভারত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
দিল্লির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আলোকেই বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে, এমন মত অনেক বিশ্লেষকের। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করা এবং একটি সুস্থিত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভারতের প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রোটোকল এবং
ভূ-রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের রীতিনীতির ভিত্তিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভারত বিবেচনা করছে বলে জানা যাচ্ছে।
ঢাকা যদি এখন এই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলিকে আলোচনার টেবিলে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা দিল্লির দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যোগাযোগের রূপকল্পকে আরও বেগবান করবে। অন্যদিকে, একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। ভারতের মূল কৌশলগত স্বার্থ হলো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং যেকোনও অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করা।
এর ঠিক বিপরীতে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের আসন্ন ভারত সফর দেশটির এক ভিন্ন কৌশলগত বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। বালেন্দ্র শাহ কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন এবং ২০২৬ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসন পেয়ে জয়ী হয়। এ বছর ২৭ মার্চ মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি ঐতিহাসিকভাবে ভূবেষ্টিত রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা জানেন। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাই সাম্প্রতিক কালে নেপাল তার সীমাবদ্ধতাকে ‘কৌশলগত ভারসাম্যে’ রূপান্তর করেছে। বালেন্দ্র শাহের দিল্লি সফরের পেছনে কোনও দুর্বলতা নেই, বরং রয়েছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের হিসাব। এ বছর আগস্ট মাসে ভোতেকোশি বন্যায় নেপালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ভারত ত্রাণ এবং বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সহায়তা করে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ফোন করে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। এখন কাঠমান্ডু ভারতের কাছ থেকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর নেপালের পুনর্গঠনের জন্য সাহায্য প্রত্যাশা করছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক মুখপাত্র সম্প্রতি জানিয়েছেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে তা দুই পক্ষের সুবিধাজনক সময় অনুযায়ী স্থির করা হবে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই দুই দেশের আলোচনার এজেন্ডায় রয়েছে কোশী নদী প্রকল্প, অযোধ্যা-জনকপুর রেল, পঞ্চেশ্বর প্রকল্প, কালাপানি-লিপুলেখ সীমান্ত বিরোধ, বিমানপথ প্রভৃতি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ শুরুতে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাদা আলাদা দেখা করা এড়িয়ে চললেও আগস্টে প্রথমবার নেপালে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে নেপালের এমন অবস্থান দেখে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তৈরি করা একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নেপাল ভারতকে তাদের এক অবধারিত অংশীদার বলে মনে করে এবং কোনও একপাক্ষিক প্রভাবের  অধীনে না থেকে সার্বভৌম সমমর্যাদার ভিত্তিতে নিজেদের অর্থনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক দাবিগুলি আদায়
করতে চায়।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, দিল্লির কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আলোকেই বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে ভারতের বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের যে কোনও কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ভারত একটি বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী অংশীদারিত্বের স্বাভাবিক রূপান্তর হিসেবেই দেখে। ভারতের মূল কৌশলগত স্বার্থ হলো এই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং যেকোনও অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা।