• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 28 October, 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিকাশে নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শ্রমিকের সম্মতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মুখ ঝাপসা করে ভিডিও প্রকাশ করলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না। সেই তথ্য কত দিন রাখা হবে, অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে কি না এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা থেকে অর্থ উপার্জন করা হবে— এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। কাজের অভাবে যাঁরা অর্থের জন্য মরিয়া, তাঁরা অনেক সময় শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। তাই কাগজে-কলমে সম্মতি থাকলেই তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন সম্মতি বলা যায় না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিকাশে নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

প্রতীকী চিত্র

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিকাশে মানুষের অভিজ্ঞতা ও কাজের তথ্য এখন অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এই সম্পদ সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন। ভারতীয় শ্রমিকেরা তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন প্রযুক্তির উন্নতিতে সাহায্য করবেন, অথচ সেই প্রযুক্তি থেকে অর্জিত বিপুল মুনাফার বড় অংশ চলে যাবে অন্য দেশের সংস্থার হাতে— এমন পরিস্থিতি কি আবার তৈরি হতে চলেছে?

কারখানার বাইরে এখন মানুষের বাড়ি, অফিস, গুদাম ও নানা কর্মক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। শুধু লিখিত নির্দেশ দিয়ে রোবটকে সব কাজ শেখানো সম্ভব নয়। কাপড় কাটা, ভঙ্গুর জিনিস সাবধানে ধরা কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার মতো কাজের জন্য দরকার হাতের নড়াচড়া, অভিজ্ঞতা এবং পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। মানুষ কীভাবে এই কাজগুলি করেন, তার ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে মানুষের দৈনন্দিন কাজের রেকর্ডিংও প্রযুক্তি শিল্পের কাছে একটি মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠছে।

ভারতের বহু শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই কাজ অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যাঁদের আয় অনিয়মিত, তাঁরা নিজেদের পরিচিত কাজের ভিডিও রেকর্ড করে কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারেন। কিন্তু এই আয়ের সুযোগকে বড় অর্থনৈতিক সাফল্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, একজন শ্রমিক সামান্য পারিশ্রমিক পেলেও তাঁর রেকর্ড করা তথ্য ব্যবহার করে কোনও সংস্থা উন্নত রোবট তৈরি করতে পারে এবং সেই রোবট বাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে। অবশ্য প্রতিটি ভিডিও থেকেই যে লাভজনক প্রযুক্তি তৈরি হবে, তা নয়। তবু শ্রমিকের সামান্য আয় এবং প্রযুক্তি সংস্থার সম্ভাব্য বিপুল লাভের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এই পরিস্থিতি ভারতের কাছে নতুন নয়। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে ভারত দক্ষ কর্মী তৈরি করেছে এবং বিশ্ববাজারে নিজের জায়গাও প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বহু ভারতীয় সংস্থা বিদেশি সংস্থার হয়ে পরিষেবা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রযুক্তির মালিকানা, গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার এবং গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বিদেশি সংস্থার হাতেই থেকেছে। অর্থাৎ কাজ ভারতে হয়েছে, কিন্তু সেই কাজের সবচেয়ে মূল্যবান ফলের উপর নিয়ন্ত্রণ থেকেছে অন্যের হাতে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই ভুল করা চলবে না। বিশেষ করে রোবটের ব্যবহার বাড়লে কারখানা, গুদাম, পরিবহণ এবং গৃহস্থালির বহু কাজে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু নতুন কাজ তৈরি হবে, আবার অনেক প্রচলিত কাজের চাহিদা কমেও যেতে পারে। তাই শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজ দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা ভাবলে চলবে না। যাঁরা প্রযুক্তির কারণে কাজ হারাবেন, তাঁদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বও সরকার ও শিল্পসংস্থাগুলিকে নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শ্রমিকের সম্মতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মুখ ঝাপসা করে ভিডিও প্রকাশ করলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না। সেই তথ্য কত দিন রাখা হবে, অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে কি না এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা থেকে অর্থ উপার্জন করা হবে— এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। কাজের অভাবে যাঁরা অর্থের জন্য মরিয়া, তাঁরা অনেক সময় শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। তাই কাগজে-কলমে সম্মতি থাকলেই তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন সম্মতি বলা যায় না।

ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি সেই তথ্যকে মূল্যবান প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার ক্ষমতা অর্জন করা। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র এবং দেশীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রোবট তৈরির সফটওয়্যার, বিশেষায়িত তথ্যভান্ডার এবং নিজস্ব এআই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্বচ্ছ চুক্তি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতকে এই নতুন বাজারে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু কম মজুরিতে মানুষের শ্রম ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করাকেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বলে মনে করাও ভুল। আসল সাফল্য নির্ভর করবে ভারত কত তথ্য সরবরাহ করল, তার উপর নয়; বরং সেই তথ্যের সাহায্যে তৈরি জ্ঞান, প্রযুক্তি, মালিকানা ও সমৃদ্ধির কতটা দেশের মানুষের হাতে রইল, তার উপর।