ভারতের অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে। এখন শহর থেকে গ্রাম, বড় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— বিভিন্ন স্তরের মানুষ ব্যাঙ্কিং পরিষেবা ও ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা পাচ্ছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, বিল মেটানো, সরকারি অনুদান গ্রহণ এবং কেনাকাটার মতো কাজ অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও। তাই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব। এই পরিস্থিতিতে ওড়িশার খোর্ধা জেলার জাটনিতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (আরবিআই) নতুন ডেটা সেন্টার ও সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন করে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে সাইবার অপরাধী ও সাইবার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব আজ বিশেষভাবে অনুভব করা যায়। কারণ, আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তি শুধু উৎপাদন, বাণিজ্য কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তার উপরেও। দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা আক্রান্ত হলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায়ীদের লেনদেন এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি— সবই বিপদের মুখে পড়তে পারে। সেই দিক থেকে এই নতুন প্রতিষ্ঠান ভারতের আর্থিক নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে।
প্রায় ১৮.৫৫ একর জমির উপর ১৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ডেটা সেন্টারটি মুম্বাইয়ের পর আরবিআইয়ের দ্বিতীয় ডেটা সেন্টার। দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ ও পরিচালনায় এর ভূমিকা থাকবে। একই সঙ্গে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) এবং ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (এনইএফটি)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে এটি সাহায্য করবে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সাইবার হামলা কিংবা অন্য কোনও বিপর্যয়ের সময় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা যত দ্রুত স্বাভাবিক রাখা যায়, ততই সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।
এই উদ্যোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তির উন্নতি ঘটলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; তার জন্য প্রয়োজন দক্ষ কর্মী, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নতুন বিপদের মোকাবিলা করার মতো জ্ঞান। এই প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সেন্টার প্রযুক্তি নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা সম্ভব হবে। সাইবার অপরাধের কৌশল ক্রমাগত বদলাচ্ছে। তাই শুধু বর্তমান সমস্যার সমাধান নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সেই প্রস্তুতিকে আরও সুসংহত করতে পারে।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, ভারতে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২,৪০০ কোটিরও বেশি লেনদেন হচ্ছে। প্রতিদিনের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি। এই পরিসংখ্যান দেশের ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক প্রসারের পরিচয় দেয়। একসময় টাকা পাঠাতে ব্যাঙ্কে যাওয়া, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো কিংবা কাগজপত্রের উপর নির্ভর করা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। এখন মোবাইল ফোনের সাহায্যে অল্প সময়ে সেই কাজ করা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, দোকানদার, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৪ সালের পর থেকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার পরিধি বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফলে আগে যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল পরিষেবার সুযোগ পাচ্ছেন। এই অগ্রগতিকে স্থায়ী করতে হলে পরিষেবার সহজলভ্যতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও মানুষের আস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণার শিকার হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি হয় না, প্রযুক্তির উপর মানুষের বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আধুনিক প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হলে তার উপর মানুষের আস্থা অটুট রাখতে হবে। আরবিআইয়ের এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।




