ব্যাটে-বলে ভারতীয় দলের ভরসা হয়ে উঠতে চান নীতীশ কুমার রেড্ডি। কিন্তু অলরাউন্ডারের দায়িত্ব সামলানো যে সহজ নয়, তা বুঝতে পারছেন তিনি। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিং, আবার অনুশীলনেও দুই বিভাগে সমান পরিশ্রম—সব মিলিয়ে চোট এড়িয়ে নিজেকে ফিট রাখাই এখন তাঁর অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
শনিবার ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে নিউজিল্যান্ডকে চার উইকেটে হারায় ভারত। সেই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন নীতীশ। বল হাতে একটি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতে মাত্র ১৩ বলে অপরাজিত ২৬ রান করেন তিনি। তিলক বর্মার সঙ্গে সপ্তম উইকেটে ৬৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটিও গড়েন। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই পার্টনারশিপই শেষ পর্যন্ত ভারতকে জয়ের রাস্তা দেখায়।
‘ব্যাটিং-বোলিং দুইই সামলাতে হয়’
ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই দায়িত্ব সামলাতে হয় অলরাউন্ডারদের। ফলে তাঁদের অনুশীলন এবং ম্যাচের ধকলও বেশি। সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে নীতীশ বলেন, ‘আমি নিজেও বিষয়টা বুঝতে শিখছি। আপনাদেরও বুঝতে হবে যে আমি একজন অলরাউন্ডার। আমাকে ব্যাটিং এবং বোলিং দুটোই করতে হয়। অনুশীলনেও নিজের ওয়ার্কলোড সামলাতে হয়। মাঠের ভিতরে এবং বাইরে আমাকে অনেক কাজ করতে হয়।’
চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে কেউই চান না। নীতীশও তার ব্যতিক্রম নন। ভারতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেয়ে খুশি তিনি। তবে ফিটনেস ধরে রাখার লড়াই যে প্রতিদিনের, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন এই তরুণ অলরাউন্ডার।
তাঁর কথায়, ‘এটা এমন একটা বিষয়, যা নিয়ে আমি নিয়মিত কাজ করছি। কেউই চোট পেতে চায় না। ভারতীয় দলের হয়ে খেলতে পারছি, এটাই আমার কাছে আনন্দের। প্রতিদিনের কথা প্রতিদিন ভাবতে হবে। পরের দিনও যদি দলের হয়ে মাঠে নামতে পারি, তা হলে সেটাই আমার কাছে দারুণ ব্যাপার—যেখানেই খেলি না কেন। আশা করি, চোট পাব না। তবে এখনও এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছি।’
গম্ভীরের মন্ত্রে চাপ সামলানোর শক্তি
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে রান তাড়া করতে নেমে একটা সময়ে চাপে পড়ে গিয়েছিল ভারত। দ্রুত উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল দল। সেই পরিস্থিতিতে নীতীশ ও তিলকের জুটি ভারতকে লড়াইয়ে ফেরায়। কী ভাবে চাপ সামলেছিলেন তাঁরা? নীতীশের মতে, কোচ গৌতম গম্ভীরের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার বার্তাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আলাদা করে কোনও বার্তা ছিল না। গৌতম স্যর বারবার বলছিলেন, আমরা যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, নিজেদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আমরা সেটাই করেছি। আর তার ফলও পেয়েছি।’
গম্ভীর যে ব্যাটারদের উপর অকারণে আগ্রাসী হওয়ার চাপ দেননি, সেটাও জানিয়েছেন নীতীশ। তাঁর কথায়, ‘উনি আমাদের উপর এমন কোনও বাড়তি চাপ দেননি যে, ক্রিজে নেমেই মারতে শুরু করতে হবে। আমরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলেছি। আমার মনে হয়, আমাদের দলে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ক্রিকেটারও রয়েছে।’
‘একটা ভাল ওভারই ম্যাচ বদলে দিতে পারে’
ব্যাটিংয়ের সময় পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন নীতীশ। বোলার কী করতে পারেন, আগের বলে কী করেছেন, পরের বলে কী ধরনের ডেলিভারি আসতে পারে—সব কিছু মাথায় রেখেই খেলতে হয় বলে মনে করেন তিনি।
নীতীশের ব্যাখ্যা, ‘সব কিছুর উপর নজর রাখতে হয়। কোনও বোলার যদি ইতিমধ্যে বাউন্সার করে থাকেন, তা হলে পরের বলে ইয়র্কার দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এই ধরনের ছোটখাটো কৌশল বুঝতে হয়। এগুলো নিয়ে আমাদের নিয়মিত কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, নিজের ব্যাটিং নিয়ে কাজ করতে হবে এবং ক্রিজে টিকে থাকতে হবে। তা হলেই যে কোনও সময় সঠিক সুযোগ চলে আসতে পারে। তখনই ম্যাচের ছবিটা বদলে যায় এবং আপনি প্রতিপক্ষের উপর চেপে বসতে পারেন। আজ ঠিক সেটাই হয়েছে। সব দিন এমন হবে না, কিন্তু বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে।’
কৃতিত্ব কিউই বোলারদেরও
ভারত জিতলেও নিউজিল্যান্ডের বোলারদের প্রশংসা করতে ভোলেননি নীতীশ। তাঁর মতে, পাওয়ারপ্লে এবং মাঝের ওভারগুলিতে ভারতীয় ব্যাটারদের উপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করেছিলেন ম্যাট হেনরি, জ্যাকব ডাফি এবং মিচেল স্যান্টনাররা।
নীতীশ বলেন, ‘আমি ম্যাট হেনরিকে কৃতিত্ব দেব। ও খুব ভাল বল করছিল। জ্যাকব ডাফিও ভাল বোলিং করেছে। পাওয়ারপ্লেতে ওরা দারুণ বল করেছে এবং আমাদের উপর চাপ তৈরি করেছিল। মাঝের ওভারগুলিতেও সেই চাপ বজায় রেখেছিল।’
স্যান্টনার এবং নিউজিল্যান্ডের অন্য বোলারদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘স্যান্টনার যেভাবে বল করছিল, অন্য বোলাররাও ভাল বল করেছে। সত্যিই ওরা ভাল বোলিং করেছে।’
তিলকের সঙ্গে জুটিতেই বাজিমাত
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিলক বর্মার সঙ্গে দ্রুত রান নেওয়ার কৌশল কাজে দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন নীতীশ। প্রতিপক্ষের উপর চাপ বাড়াতে একটি ভাল ওভারই যে যথেষ্ট, সেটাই বুঝেছিলেন তাঁরা।
নীতীশের কথায়, ‘আগেই বলেছি, একটা ভাল ওভারই ম্যাচের ছবিটা বদলে দিতে পারে। তখনই বোঝা যায়, প্রতিপক্ষ চাপে পড়ছে। আমরা সেই মুহূর্তটা কাজে লাগিয়েছিলাম। তার পর আমি আর তিলক উইকেটের মধ্যে দ্রুত দৌড়ে রান নিয়েছি। ব্যাপারটা দারুণ ছিল। আমার খুব ভাল লাগছিল। আমার মনে হয়, ওই সময়েই আমরা ম্যাচটা জিতে নিয়েছিলাম।’
ব্যাটে-বলে অবদান রেখে ভারতকে জেতানোর পাশাপাশি নীতীশ বুঝিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না। ফিটনেস, পরিস্থিতি বুঝে খেলা এবং কঠিন সময়ে নিজের উপর বিশ্বাস রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




