• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 23 October, 2026

বিশ্ববাজারে ১১৫ ডলার ছুঁল অপরিশোধিত তেল: যুদ্ধের আঁচে পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ দর, পেট্রল ও রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কা

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে ৫ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে অপরিশোধিত তেলের দাম। ব্রেন্ট ক্রুড ছুঁল ১১৫ ডলার, খালি করা হল সৌদি আরামকোর দফতর। ভারতে পেট্রল-ডিজেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কা।

বিশ্ববাজারে ১১৫ ডলার ছুঁল অপরিশোধিত তেল: যুদ্ধের আঁচে পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ দর, পেট্রল ও রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কা

জ্বালানির দাম (প্রতীকী AI নির্মাণ)

পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রে বারুদের গন্ধ যত তীব্র হচ্ছে, ততই আগুন লাগছে বিশ্ববাজারের জ্বালানি দরে। হরমুজ প্রণালীতে পর পর পণ্যবাহী জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের বুকে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের জেরে শুক্রবার পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেল অপরিশোধিত তেলের দাম (Brent Crude price)। আন্তর্জাতিক বাজারে এদিন এক সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেল পিছু ১১৫ ডলারের গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলে। আর বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার আঁচ সরাসরি এসে পড়তে চলেছে ভারতের বাজারে। কালীপুজো ও দীপাবলির ঠিক মুখে অপরিশোধিত তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যে পেট্রল-ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের (LPG cylinder price) দাম নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরামকোর দপ্তর খালি ও তেলের বাজারে ঝড়

সংবাদসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১ ডলার ৪০ সেন্ট বা ১.২ শতাংশ বেড়ে ১১৪ ডলার ৫৭ সেন্টে দাঁড়ায়। তার কিছু ক্ষণ আগেই তা ১১৫ ডলারের শিখর ছুঁয়েছিল, যা গত ৪ মে-র পর সর্বোচ্চ। একই ছবি মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই (WTI crude) অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রেও। ব্যারেল পিছু ১ ডলার ৪৮ সেন্ট বা ১.৫ শতাংশ বেড়ে ডব্লিউটিআই তেলের দর পৌঁছেছে ১০০ ডলার ৯৫ সেন্টে। এ নিয়ে টানা তিন সপ্তাহ বাড়ল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম, শুধু চলতি সপ্তাহেই বৃদ্ধির হার ৪.২ শতাংশ।

তেলের বাজারে এই আচমকা উল্লম্ফনের নেপথ্যে রয়েছে বৃহস্পতিবারের একটি বড় ঘটনা। সংঘাত তীব্র হওয়ায় বৃহস্পতিবার বাহরিনের কাছে উপসাগরীয় উপকূলের ধাহরানে নিজেদের মূল সদর দপ্তর তড়িঘড়ি খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক সংস্থা সৌদি আরামকো (Saudi Aramco)। অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকারের সমর্থক সৌদি জোটের বিরুদ্ধে লড়াইরত হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর দিকে এগোতে শুরু করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথও অবরুদ্ধ হওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ভারতের ঘাড়ে জোড়া খাঁড়া

পশ্চিম এশিয়ার এই জ্বালানি সংকট ভারতের অর্থনীতির কাছে জোড়া ফলার মতো বিঁধছে। নিজের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল এবং সিংহভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করে ভারত, যার মূল জোগানদার উপসাগরীয় দেশগুলি। একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল পিছু ১১৫ ডলারে পৌঁছে যাওয়া, অন্যদিকে ডলারের নিরিখে ভারতীয় টাকার ঐতিহাসিক পতন– এই দুইয়ের জেরে ভারতের তেল আমদানির খরচ রকেটগতিতে বাড়ছে। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া এবং বিমার খরচও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।

ইউবিএসের (UBS) বাজার বিশ্লেষক জিওভান্নি স্তাউনোভো জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তেলের জোগান পুরোপুরি থমকে যেতে পারে। অস্থিরতা ও পরিবহনের চড়া খরচের কারণে ইতিমধ্যেই বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে এক্সএস ডটকমের বিশ্লেষক লিন ট্রানের মতে, হামলা যদি অব্যাহত থাকে এবং তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগে, তবে চড়া দামের এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলির (IOC, BPCL, HPCL) প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের ক্ষতি বা আন্ডার-রিকভারি শুরু হয়েছে।

দীপাবলির মুখেই বাড়বে পেট্রল-ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম?

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাধারণত ৮০ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যে থাকলে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি খুচরো বাজারে দামের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। কিন্তু সেই দাম ১১৫ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় সংস্থাগুলির পক্ষে দীর্ঘদিন ভর্তুকির বোঝা টানা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। ফলে উৎসবের মরশুম মিটলেই বা তার আগেই পেট্রল-ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে তেল সংস্থাগুলি।

পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে এই খবর অত্যন্ত উদ্বেগের। বর্তমানে কলকাতায় এমনিতেই পেট্রলের দাম লিটার পিছু ১১৩ টাকার ঘরে এবং ডিজেলের দাম ৯৯ টাকার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এর ওপর নতুন করে ডিজেলের দাম বাড়লে রাজ্যে পণ্য পরিবহণের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। দুর্গাপুজোর পর থেকেই কলকাতা ও জেলাগুলির বাজারে আনাজপাতি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম চড়ে রয়েছে। ডিজেল মহার্ঘ হলে পরিবহণ খরচের চাপে বাজারদর আরও নাগালের বাইরে চলে যাবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (LPG) জোগান ব্যাহত হওয়ায় গৃহস্থের রান্নার গ্যাস এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম বাড়ার কালো মেঘও ঘনিয়েছে বাংলার আকাশে।