উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে দুর্গাপুজো (Durga Puja) শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয় বরং বিভি্ন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধনের মাধ্যম। চিলাপাতা জঙ্গলে প্রতি বছর দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে জড়ো হন বনকর্মী থেকে চা-বাগানের শ্রমিক এবং আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দারা। ফলে এই উৎস শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপনের উপলক্ষ।
চিলাপাতা রেঞ্জে দুর্গাপুজো (Durga Puja) শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। কয়েক দশক ধরে এই পুজো বনাঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বনদপ্তর এবং সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কেরও প্রতিফলন দেখা যায় এই উৎসবে। নীলপাড়া রেঞ্জের দুর্গাপুজোর ইতিহাস অবশ্য আরও পুরনো। দুর্গম এই এলাকায় আশপাশে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান না থাকায় ১৯৩০-এর দশকে তৎকালীন রেঞ্জ আধিকারিক বনকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। পরে ১৯৫১ সালে পুজোকে কেন্দ্র করে একটি ক্লাব গড়ে ওঠে। তাতে চা-বাগানের শ্রমিক এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দারাও অংশ নিতে শুরু করেন।
দুর্গম বনাঞ্চলে এক সময় বন দপ্তরের কার্যালয়গুলিই ছিল বিভিন্ন এলাকার মানুষের একত্রিত হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বিস্তীর্ণ জঙ্গল পেরিয়ে বিচ্ছিন্ন জনবসতিগুলির মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ ছিল সীমিত। সেই পরিস্থিতিতে পুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মিলনক্ষেত্র ক্রমে সামাজিক সম্প্রীতির পরিসর হয়ে ওঠে। পেশা, সম্প্রদায় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্য ভুলে মানুষ একসঙ্গে উৎসবে শামিল হতে শুরু করেন।
বন্যপ্রাণের পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঠিকানা চিলাপাতা
আলিপুরদুয়ারে অবস্থিত চিলাপাতা উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অঞ্চল। এই বনাঞ্চল জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এবং বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের মধ্যে হাতিদের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। হাতি, গন্ডার, চিতাবাঘ এবং গৌরের মতো বন্যপ্রাণের আবাসস্থল এই বনাঞ্চল জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও সমৃদ্ধ।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: মহাষ্টমীর পুজোয় কাজল, মেয়ে নাইসা ও বোন তানিশার সঙ্গে পুজো দিলেন অভিনেত্রী
চিলাপাতা ও তার আশপাশের এলাকার সঙ্গে আদিবাসী রাভা সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি, এখানে রয়েছে প্রাচীন নলরাজার গড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা সাধারণত এই অঞ্চলের আদি মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। তাই চিলাপাতার গুরুত্ব শুধুমাত্র বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার গ্রাম, চা-বাগান, জনজাতি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা এবং ঐতিহাসিক নির্দশন মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। ডুয়ার্সকে বুঝতে গেলে এই বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি।
এই ঐতিহাসিক পরিচিতিকে তুলে ধরতে কোচ রাজ্যের কিংবদন্তী সেনাপতি বীর চিলারায়ের নামে একটি সংগ্রহশালা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংগ্রহশালা উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চিলাপাতার দুর্গাপুজো মনে করিয়ে দেয়, জঙ্গল শুধু সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনও প্রাকৃতিক পরিসর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন, ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা যৌথ স্মৃতি। বন সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ-এই তিনের মেলবন্ধনেই ডুয়ার্সের এই পুজো স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে।




