শুক্রবার নতুন দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (Cockroach Janta Party-CJP) ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে স্থগিতাদেশ দিতে স্পষ্ট অস্বীকার করল দিল্লি হাইকোর্ট। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগে উত্তাল দেশ। এই প্রেক্ষিতেই যন্তরমন্তরকে নির্দিষ্ট বিক্ষোভস্থল হিসেবে নিষিদ্ধ করে দিল্লি পুলিশ। যার প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা গেট টপকে যন্তরমন্তরে ঢুকে জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ করেন। সেই অপরাধে আপাতত জেলে রয়েছেন সিজেপির দুই পরিচিত নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রঙ্কা। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিরোধীরা। ষষ্ঠীর বিকেলে কনট প্লেসে জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ কর্মমূচির ডাক দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিকে চ্যালেঞ্জ করে একপক্ষ আদালতে গেলেও লাভ হয়নি। কারণ বৃহস্পতিবার জমায়েত বাতিলের আর্জি খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, জনজীবন স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশকে আইনের সমস্ত ধারা প্রয়োগ করে জমায়েত ‘নিয়ন্ত্রণ’ (regulate) করতে হবে। কিন্তু আদালত প্রতিবাদ কর্মসূচিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে না। পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়ে পুলিশের দেওয়া আশ্বাস নথিভুক্ত করেই এই নির্দেশ দিয়েছে কার্যনির্বাহী প্রধান বিচারপতি নীতিন বাসুদেব সাম্বরে এবং বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার ডিভিশন বেঞ্চ।
আদালতের অবস্থান
কনট প্লেসের ব্যবসায়ীদের জীবিকার সুরক্ষার সওয়াল তুলে হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত রিট পিটিশনটি দাখিল করেছিলেন এক লাইসেন্সপ্রাপ্ত হকার। মামলাকারীর আইনজীবীর সওয়াল ছিল, দশেরার মুখে এবং উৎসবের ভরা মরশুমে মধ্য দিল্লির বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ডে এমন সমাবেশ ডেকে বসলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত রুদ্ধ হবে। এর আগের দফায় যন্তরমন্তর চত্বরে বিক্ষোভের জেরে দীর্ঘ সময় দোকানপাট বন্ধ থাকায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। নতুন করে আবার সেন্ট্রাল পার্কে বিশৃঙ্খলা বাঁধলে ব্যবসায়ীদের পথে বসার জোগাড় হবে। শুনানিতে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা আদালতকে আশ্বস্ত করে জানান, আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে এবং সিজেপির জমায়েত নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ইতিমধ্যেই উপযুক্ত সতর্কতামূলক বন্দোবস্ত সেরে রেখেছে। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পরেই আদালত গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করার পদক্ষেপ খারিজ করে দেয়।
মোদী-জ্ঞানেশ আঁতাত তোপ
আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হতেই প্রতিবাদের সুর আরও চড়িয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে (Abhijeet Dipke)। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আইসা (AISA) নেত্রী নেহা বোরা ও অভিনেতা প্রকাশ রাজকে পাশে নিয়ে এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, স্রেফ একজন ব্যক্তি জ্ঞানেশ কুমারকে আড়াল করতেই গত পনেরো দিন ধরে দিল্লির রাজপথ থেকে ছাত্র-যুব ও অধিকারকর্মীদের টেনে-হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলা হচ্ছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ শীর্ষ বিরোধী নেতাদের রাস্তায় হেনস্থা হতে হয়েছে। জাতীয় পতাকা হাতে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রঙ্কাকে অনুপ্রবেশের মিথ্যা ধারায় এখনও তিহাড়ের কুঠুরিতে বন্দি রাখা হয়েছে।
বিরোধীদের এককাট্টা মঞ্চ
শুক্রবার কনট প্লেসের এই জমায়েতকে ঘিরে দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণও দ্রুত বদলে গিয়েছে। এত দিন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA bloc) জোটের মঞ্চ থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা আম আদমি পার্টিও (AAP) জাতীয় পতাকা নিয়ে সিজেপির এই সেন্ট্রাল পার্ক অভিযানে শামিল হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সেরেছে। ফলে নাগরিক সমাজের ক্ষোভের সঙ্গে রাজনৈতিক শিবিরের সংহতি মিলে গিয়ে শুক্রবার বিকেলে মধ্য দিল্লিতে বড়সড় জমায়েতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্য দিকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (Special Intensive Revision-SIR) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে বিরোধীদের দায়ের করা মামলায় নির্বাচন কমিশন ও খোদ জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে নোটিস জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে আদালতের দরজায় ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তাঁর সাফ বার্তা, বিচারবিভাগকে কোনও রাজনৈতিক চাপ বা হুংকার দিয়ে প্রভাবিত করা যাবে না। শীর্ষ আদালতের এই হুঁশিয়ারি এবং হাইকোর্টের নজরদারির নির্দেশের মধ্যেই শুক্রবারের তেরঙা জমায়েত ঘিরে রাজধানীর নিরাপত্তা চূড়ান্ত মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে।




