হাওড়ার শিবপুরে বনেদি বাড়ির পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হল রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই পুজো। এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক গল্পকথা। তৎকালীন জমিদার ছিলেন রামব্রহ্ম রায়চৌধুরী। তাঁর একটি কন্যাসন্তান ছিল।
বাড়ির সামনে একটি পুকুর ধারে বসে সে খেলা করত। বর্তমানেও পুকুরটি রয়েছে। যার নাম বালিপুকুর। সেই পুকুরপাড়ে বসে জমিদারে মেয়ে, পদ্মাবতী নামের একটি মেয়ের সঙ্গে খেলা করত। শুধু খেলা নয়, খেলার শেষে দু’জনে মিলে পুকুরে স্নানও করত।

জমিদার রামব্রহ্ম তার মেয়েকে পদ্মাবতীর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে। তবে পদ্মাবতী জমিদারের সঙ্গে দেখা করতে চায় না। এই কথা শুনে রামব্রহ্ম রেগে যান এবং পদ্মবতীকে ধরতে পেয়াদা পাঠান। পেয়াদার পদ্মবতীর খোঁজ পায় না। পুকুরপাড়ে শুধু তার পায়ের ছাপ দেখতে পায়। অনেক চেষ্টা করেও খোঁজ পাওয়া যায় না পদ্মবতীর।

সেই রাতেই জমিদার রামব্রহ্মকে স্বপ্নে দেখা দেন পদ্মাবতী। স্বপ্নে রাজাকে বলেন, তিনি দেবী দুর্গা। তিনি জমিদার কন্যার সঙ্গে রোজ খেলা করেন। তাঁর পুজো যেন শিবপুরের রায়চৌধুরী পরিবারে হয়। এই স্বপ্নাদেশের পর থেকেই রায়চৌধুরী পরিবারে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়। উল্লেখ্য এই বাড়ির গৃহদেবী হলেন মা ব্যাতাইচণ্ডী।

বাঁশের আটচালা দুর্গামণ্ডপে প্রথম পুজো শুরু হয়। বর্তমানে এটি ‘সাঁজের আটচালা’ নামে খ্যাত। তিনচালা ডাকের সাজের মায়ের মূর্তি এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কৃষ্ণনবমীতে মায়ের বোধন হয়ে এখানে। বৃহন্নন্দীকেশ্বর মতে অর্থাৎ বেলুড়মঠে যে রীতি মেনে পুজো হয়, সেই রীতিই এখানে অনুসরণ করা হয়।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: হাওড়ার দু’হাতের অভয়া দুর্গা, যেখানে আজও রয়েছে মহিষ বলির প্রথা
প্রতিমা নির্মাণের পরে অঞ্চলের বহু ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রিত করা হয়। মায়ের মূর্তি নির্মাণে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না, তা তাঁরা পরীক্ষ করে পরিবারের সদস্যদের জানান। ছাড়পত্র পাওয়ার পরেই শুরু হয় চূড়ান্ত পর্বের মূর্তি গড়ার কাজ।

এখানে পুজোয় মায়ের মূর্তির সামনে কোনও ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয় না। একটি বেলগাছের গোড়ায় সেটি রাখা হয়। দুর্গাদালানে দেবীমূর্তির পাশাপাশি দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বেলঘরে রাখা ওই ঘটে পুজো করা হয়।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কথিত রয়েছে এই আশ্রমে প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল, গড়জঙ্গলের আশ্রম সংরক্ষণের দাবি
এই পুজোয় এখনও বলি দেওয়া হয়। সপ্তমীর দিনে একটি এবং অষ্টমী ও নবমীর দিন দু’টি করে পাঁঠা বলি হয়। রায়চৌধুরী বাড়িতে সাদা পাঁঠা বলি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এই পরিবার ঘোর ব্রিটিশ বিরোধী ছিল। ব্রিটিশ শাসককে কল্পনা করেই সাদা পাঁঠা বলি দেওয়া হত। শুধু তাই নয়, এঁদের বাড়ির পুজোয় ব্রিটিশদের প্রবেশের কোনও অনুমতি ছিল না। তবে ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

এখানকার ভোগে থাকে নানারকম মিষ্টান্ন, নারকেল নাড়ু এবং বিভিন্ন রকমের ফল। নবমীর দিন হোম সম্পন্ন হলে হাঁড়িকাঠ উড়িযে দেওয়া হয়। তারপর হয় পংক্তিভোজন। রায়চৌধুরী পরিবারে দশমীর দিন দেবী দুর্গার মূর্তি ভাসান দিয়ে তাঁর মাথার মুকুট গৃহদেবী ব্যাতাইচণ্ডীর মাথায় পরানো হয়।
দেখুন:




