• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 6 October, 2026

শরৎ এল রে: হাওড়ার দু’হাতের অভয়া দুর্গা, যেখানে আজও রয়েছে মহিষ বলির প্রথা

পুজোর সঙ্গে পাল পরিবারের পূর্বপুরুষ সর্বেস্বর পালের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর সময় থেকেই এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরে বটকৃষ্ণ পালের সময়ে পুজোর পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়

শরৎ এল রে: হাওড়ার দু’হাতের অভয়া দুর্গা, যেখানে আজও রয়েছে মহিষ বলির প্রথা

Image: SNS

দশভুজা বা মহিষাসুরমর্দিনী নন।তিনি অভয়া, রয়েছে দু’হাত। কলকাতার খুব কাছেই হাওড়ার শিবপুরে হয় এই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Puja)। আর এই পুজোর (Durga Puja) সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালি ওষুধ ব্যবসায়ী বটকৃষ্ণ পালের নাম। বাড়ির জৌলুস না থাকলেও রয়েছে ঐতিহ্য এবং পরম্পরা। কাঠামোপুজো থেকে বিসর্জন, নবপত্রিকার স্নান থেকে ধুনো পোড়ানো—প্রতিটি রীতির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বহু প্রজন্মের স্মৃতি। আজকের শহুরে জীবনের ভিড়ে বাড়িটি তাই হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত ইতিহাসের দলিল। ৩৮, নবগোপাল মুখার্জি লেনের এই বাড়ি বটকৃষ্ণ পালের আদি বাড়ি হিসেবে পরিচিত। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন।

পুজোর বয়স প্রায় তিনশো বছর বা তারও বেশি বলে মনে করা হয়। তবে পুজোটি ঠিক কত সালে শুরু হয়েছিল, তার কোনও প্রমাণ সেভাবে পাওয়া যায় না। এই পুজোর সঙ্গে পাল পরিবারের পূর্বপুরুষ সর্বেস্বর পালের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর সময় থেকেই এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরে বটকৃষ্ণ পালের সময়ে পুজোর (Durga Puja) পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়। কথিত আছে, এই দেবী অসুরবিনাশী নন। তিনি অভয়া। ভক্তের ভয় হরণকারী মায়ের রূপ। কুমোরটুলির শিল্পীরা বংশপরম্পরায় এই বাড়ির প্রতিমা গড়ে আসছেন। শুধু মৃৎশিল্পী নন, ঢাকিরাও বংশ পরম্পরায় এখানে ঢাক বাজাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কার্তিকের বাহন ময়ূর, গণেশের বাহন ইঁদুর, কেন?

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেবীর রূপ। তাঁর মাত্র দু’টি হাত। একটি হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গি, অন্য হাতে রয়েছে পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মের সঙ্গে ফল। দেবীর সঙ্গে মহিষাসুর নেই। সিংহবাহিনী এই দ্বিভুজা দেবীমূর্তি বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

রথের দিন কাঠামোপুজো দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা তৈরি। প্রতিমা ঠাকুরদালানেই তৈরি করা হয়। কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে চণ্ডীপাঠের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে যায় পুজো (Durga Puja)। চলে দুর্গা নবমী পর্যন্ত। এখানে পুজো হয় শাক্ত মতে। নবপত্রিকা স্নানেও রয়েছে নিজস্ব রীতি। বাড়িতেই নবপত্রিকার স্নান করানো হয়। সন্ধিপুজো তান্ত্রিক রীতিতে করা হয়। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ান বাড়ির মহিলারা। শুধু বাড়ির মহিলা নয়, প্রতিবেশী মহিলারাও এতে অংশ নেন।

আরও পড়ুন: শরৎ এর রে: কংস নারায়ণের হাত ধরেই সর্বজনীন দুর্গাপুজোর শুরু, তাঁর নামে মূর্তি তৈরির রীতি চালু হয়

এখানে পুজোর তিনদিনই বলি দেওয়া হয়। সপ্তমী এবং সন্ধিপুজোয় ছাগ বলি এবং পাঁচটি ফল বলি দেওয়া হয়। নবমীতে মহিষ বলি দেওয়া হয়। মহিষ বলি নিয়েও রয়েছে একটি কাহিনি। শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোয় মহিষ বলি দেওয়ার প্রথা ছিল। কথিত রয়েছে কোনও এক পুজোয় হাড়িকাঠ নিয়ে মহিষ গিয়ে পালবাড়িতে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়। তারপর থেকেই এই বাড়িতে মহিষ বলি দেওয়ার প্রথা চালু হয়। পুজোর ভোগেও আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্নভোগের পরিবর্তে লুচি, নানা ধরনের মিষ্টি ও ফল নিবেদন করা হয়ে থাকে।

নবমীর পুজো শেষে বাড়ির মহিলারা দশমীর তোড়জোড় শুরু করেন। দশমীতে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন বাড়ির মহিলারা। বিসর্জনের দিন পরিবারের সদস্যরা দেবীর প্রতিমা কাঁধে নিয়ে গঙ্গার ঘাটে যেতেন বলে উল্লেখ রয়েছে। বটকৃষ্ণ পাল পরে কলকাতা শোভাবাজারে নিজের মামাবাড়িতে চলে গিয়ছিলেন। সেখানেই দুর্গাপুজোর (Durga Puja) পরিবর্তে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। আর শিবপুরের আদি বাড়িতে দুর্গাপুজো (Durga Puja) ঐতিহ্য ও পরম্পরায় চলতে থাকে। জৌলুস কমলেও ঐতিহ্যে আপস করেনি পরিবার। আজ শিবপুরের এই বাড়ির পরিচয় শুধু বটকৃষ্ণ পালের জন্মভিটে হিসেবে নয়, অভয়া দুর্গার ঠিকানা হিসেবেও।

দেখুন: