পুজোয় বড়পর্দায় মুক্তি পেতে চলা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘এম্পারর ভার্সাস শরৎচন্দ্র’তে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে পর্দায় আসছেন টোটা রায়চৌধুরী।
শরৎচন্দ্রকে আমরা তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মাধ্যমেই চিনি। তাঁকে ধারণ করতে গিয়ে তোমার কি কখনও মনে হয়েছে, একজন মানুষ নয়, তাঁর তৈরি একটা গোটা জগৎকেই ধারণ করছ?
টোটা: শরৎবাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তো বহু, তার সবটা একটা ছবির পরিসরে আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ভাবনা এবং চিত্রনাট্যই আমার কাছে ম্যাপ হিসেবে কাজ করেছে। মূলত তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়সের সময়কাল এবং তার সামান্য আগের লেখালেখির পর্বটাকেই এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অদ্ভুতভাবে এটা আবিষ্কার করলাম, শরৎবাবুকে নিয়ে কোনো ভিডিও বা অডিও এভিডেন্স নেই, ছবিও মাত্র চার-পাঁচটা। তাই তাঁর পরিবার, বংশধর, ইতিহাসবিদ এবং শরৎ-গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে, পুরোনো নথি সংগ্রহ করে চরিত্রটা গড়ে তুলতে হয়েছে। সৃজিতের বিস্তৃত গবেষণা ভীষণ সাহায্য করেছে।
পানিত্রাসে রূপনারায়ণের তীরে শরৎবাবুর বাড়িটা হেরিটেজ ঘোষণার আগে এক অকৃতদার ভদ্রলোক স্বেচ্ছায় বাড়িটা পাহারা দিতেন। বিনা পারিশ্রমিকে গাইডের কাজ করতেন। এই ভালবাসাকে কীভাবে দেখো? শরৎবাবুর ‘ক্যাচ’ কী ছিল, স্টার পাওয়ার?
টোটা: বহু বছর আগে দেউলটিতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে আমারও দেখা হয়েছিল। সমাজে কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা শুধুই ভালবাসার টানে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কোনো একটি কাজের প্রতি জীবন উৎসর্গ করেন। এঁরা অতিমানব, এঁদের জন্যই আমাদের ইতিহাস বেঁচে থাকে। আজকের টাকা-আনা-পাইয়ের জগতে মানুষকে এমন নিঃস্বার্থ ভক্তি, ভালবাসা বোঝানো খুব কঠিন। ওঁর মতো মানুষকে প্রণাম এবং স্যালুট জানানো ছাড়া কিছু বলার থাকে না।
শরৎচন্দ্রের কোন সত্তাটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে— লেখক, মানুষ, নাকি সময়ের সঙ্গে লড়তে থাকা এক শিল্পী?
টোটা: শরৎবাবুর লড়াকু স্বভাবটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি যখন ‘পথের দাবী’ লিখছেন, তখন তিনি ভারতবর্ষের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল লেখকদের একজন। বিক্রি, রয়্যালটি, খ্যাতি… সব দিক থেকেই তিনি শীর্ষে। চাইলে বাকি জীবনটা খুব সুখে অতিবাহিত করতে পারতেন। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার তাগিদে জীবনের সমস্ত অর্জন বাজি রেখে তিনি ‘পথের দাবী’ লিখলেন। সবকিছু থাকা সত্ত্বেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই জেদটাই তাঁর আসল পরিচয়।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি উনি দীর্ঘদিন ডাক্তারিও করেছেন। এই বহুমুখী প্রতিভাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবে?
টোটা: তখনকার দিনে বহু মানুষই ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী প্রতিভাধর হতেন। মানুষের জানার আগ্রহ আর একাগ্রতা বেশি ছিল, আজকের মতো মোবাইল ফোনের ডিস্ট্রাকশন ছিল না। অনায়াসেই অনেকে পাঁচ-ছয়টি ভাষা আয়ত্ত করতেন। শরৎবাবু বহু বছর রেঙ্গুনে কাটিয়েছেন, যা তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। ফলে বার্মিজ, থাই, মালয় কিংবা তামিল ভাষার আবহ তাঁর চেনা ছিল, যার ছাপ ‘পথের দাবী’ এবং সব্যসাচী চরিত্রের মধ্যেও স্পষ্ট।
শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক সত্তা আর কথাসাহিত্যিক সত্তা, দুটোকে অভিনয়ে কীভাবে মিলিয়েছ?
টোটা: ব্যক্তি শরৎচন্দ্রের অনেক পরত ছিল, সবগুলোর সঙ্গে একাত্ম হতে গেলে অনেক সময় লাগত। তাই প্রতিটা দৃশ্যে আমি শুধু তার নির্যাসটুকু ধরতে চেয়েছি। ভেবেছি, তখন তাঁর বয়স কত, মানসিক অবস্থা কেমন, ঠিক আগে কী ঘটেছে আর পরে কী ঘটবে। এভাবে কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তব, কিছুটা তথ্য আর কিছুটা নিজের চিন্তা মিলিয়ে অভিনয় করেছি।
‘এম্পেরর ভার্সাস শরৎচন্দ্র’…নিছকই ঔপনিবেশিক সরকার আর একজন লেখকের সংঘাত, নাকি ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্রশক্তি?
টোটা: এটা আসলে শক্তি বনাম ব্যক্তি। সাধারণ ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্রশক্তির লড়াই। তিনি রাষ্ট্রশক্তির অন্যায়কে মেনে নেননি বলেই কলম ধরেছিলেন। ক্ষমতা বা শাসক কোনোদিনই বিরুদ্ধ স্বর সহ্য করতে পারে না, তাই নিষিদ্ধ বা সেন্সর করে তা দমন করার চেষ্টা করে। কিন্তু সময়ের বিচারে রাষ্ট্রশক্তি সবসময়ই নির্ভীক সত্যের কণ্ঠস্বরের কাছে পরাভূত হয়েছে।
আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং আর আউটরেজের মধ্য দিয়ে যে ‘সামাজিক সেন্সরশিপ’ তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে কি সেই সময়ের মিল আছে মনে কর?
টোটা: আক্রমণের রূপ বা পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য একই… বিরুদ্ধ কন্ঠস্বরকে দমিয়ে দেওয়া। এখনকার সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষোভের অনেকটাই অর্গ্যানিক নয়, ম্যানুফ্যাকচার্ড। একটা ইল্যুশনের জায়গা। একই ব্যক্তি একাধিক ছদ্মনামে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আক্রমণ চালাচ্ছে। ক্ষমতাশালীরা এই ট্রোলিংকে নিজেদের স্বার্থে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
একই প্রযোজনা সংস্থার পরপর দুটো ছবিতে বিপ্লবীদের দেখা গেল। একটাতে সশস্ত্র লড়াই, অন্যটাতে একটা ঘরে বসে ঠান্ডা মাথায় কলমের মাধ্যমে বিপ্লব করা। এটা পর্দায় ফুটিয়ে তোলা কতটা কঠিন ছিল?
টোটা: এই রূপটা ফুটিয়ে তোলা সশস্ত্র লড়াইয়ের সমান কঠিন। আসলে শরৎবাবুর লেখার টেবিলটাই হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের কন্ট্রোল রুম। নিঃশব্দে ঘরে বসে তিনি শব্দের মাধ্যমে তির ছুঁড়ছেন, আর প্রতি মাসে পত্রিকায় তা প্রকাশের পর সেই ভাবনার বিস্তার ঘটছে বহুগুণে। চারপাশের বিরুদ্ধ শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে জেনেও, শান্ত মাথায় শিল্পের মান বজায় রেখে নিখুঁত নিশানায় লিখে যাওয়া সোজা কথা নয়।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মুখের ওপর ভাল কথা বলে পেছনে কুৎসা করার সংস্কৃতি এখন বেশি দেখা যায় বলে অভিযোগ…
টোটা: পেছনে কথা বলার চল সবসময়ই ছিল, এমনকি বাংলা সিনেমার তথাকথিত সোনালি যুগেও ছিল। মুখের সামনে সত্যি কথা বলার সাহস কেবল প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীরাই দেখাতে পারে। এখন হয়ত সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে প্রকাশের ভঙ্গি বদলেছে, কিন্তু মানুষের আচরণে বিশেষ বদল আসেনি।
একজন শিল্পীর আসল সাফল্য মানুষকে বিনোদন দেওয়ায়, নাকি তাকে আনকমফর্টেবল করে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করায়?
টোটা: বিনোদন দেওয়া অবশ্যই প্রাথমিক দায়িত্ব, কারণ দর্শক টিকিট কেটে তাঁর সময় দিচ্ছেন। তবে বিনোদনের পাশাপাশি যদি দর্শকের মনে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগিয়ে তোলা যায়, যার উত্তর খুঁজতে তাঁদের ভাবতেই হবে, তবেই শিল্পী হিসেবে কাজ সার্থক হয়।
অল্প বাজেটের একটা সিনেমা হঠাৎ বিপুল ব্যবসা করার নজিরকে বাংলা সিনেমার প্রেক্ষিতে কীভাবে দেখছ?
টোটা: এটা বিরল ঘটনা বা ব্যতিক্রম। সারা দেশে পাঁচ বছরে চার হাজার ছবির মধ্যে এমন ঘটনা হয়তো একটা-দুটো ঘটে। যেমন অতীতে ‘জয় সন্তোষী মা’ অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল। যেমন উত্তমকুমার এক শতাব্দীতে একজনই হন। ইটস্ অ্যান এক্সেপসন, নট আ রুল। আর এতে হীনমন্যতায় ভোগারও কোনো কারণ দেখছি না।
তোমার প্রিয় শরৎ-উপন্যাস ও চরিত্র কোনটা?
টোটা: প্রিয় উপন্যাস ‘পথের দাবী’ এবং প্রিয় চরিত্র সব্যসাচী মল্লিক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সুপারহিরো হলেন সব্যসাচী। ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটীর মতো জনপ্রিয় চরিত্র সবাই তাঁর অনেক পরে এসেছেন।
রক্তমাংসের শরৎচন্দ্রের সামনে বসে তাঁকে যদি একটা মাত্র প্রশ্ন করতে পারতে, কী জিজ্ঞাসা করতে?
টোটা: আমি জানতে চাইতাম, সারাজীবনের অর্জিত প্রতিষ্ঠা, ধনসম্পত্তি, সুনাম… সবকিছু বাজি রেখে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার এই সাহসটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন সেই সময়? সেই মুহূর্তে আপনার ভেতরে ঠিক কী চলছিল, যদি বলেন।




