পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। রাজ্যে নতুন সরকারের উদ্যোগে এবং কেন্দ্রের সহযোগিতায় একসঙ্গে একাধিক বিমানবন্দর চালু করার যে পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক বিমান পরিষেবার উপর নির্ভর না করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তকে আকাশপথের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাংলার অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন গতি দিতে পারে।
কেন্দ্রের ‘উড়ান ২.০’ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের চারটি বিমানবন্দর— পুরুলিয়ার ছররা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কলাইকুণ্ডা— যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের বহু জেলা উন্নত বিমান যোগাযোগের অভাবে পিছিয়ে ছিল। এই বিমানবন্দরগুলি কার্যকর হলে কলকাতার বাইরে থেকেও মানুষের দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন— সব ক্ষেত্রেই এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর সঙ্গে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের উপর চাপ কমাতে নদিয়ার কল্যাণীতে প্রায় ২০০০ একর জমিতে আন্তর্জাতিক গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব আরও বড় পদক্ষেপ। কলকাতা ও তার আশপাশের বিমান পরিবহনের ভবিষ্যৎ চাহিদা যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নতুন বিমানবন্দর হলে আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ উড়ানের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কলকাতাকে পূর্ব ভারতের আরও শক্তিশালী বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তবে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন, প্রযুক্তিগত সমীক্ষা, অর্থের সংস্থান এবং নির্মাণ— প্রতিটি ধাপ সময়মতো শেষ করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যকে সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু উন্নয়নের প্রশ্নে প্রশাসনিক সহযোগিতাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কলকাতা থেকে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে সরাসরি বিমান পরিষেবা চালুর দাবি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লে রাজ্যের পর্যটন, শিল্প, বাণিজ্য এবং পরিষেবা ক্ষেত্র উপকৃত হবে। একইভাবে অন্ডালের কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দরকে দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও গুয়াহাটির সঙ্গে আরও শক্তিশালীভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনাও বাস্তবসম্মত। উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য ও উদ্যানজাত পণ্য দ্রুত দেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিমান পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও সরাসরি বিমান যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। অযোধ্যা, তিরুপতি বা অমৃতসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ বাড়লে পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি ছোট ব্যবসা, হোটেল, পরিবহন ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে।
মালদহ ও কোচবিহার বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া এবং বেহালা ফ্লাইং ক্লাবে আধুনিক বিমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবও ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ। বিমান পরিষেবা শুধু যাত্রী পরিবহনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রশ্নও জড়িত।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দু’বছরের মধ্যে রাজ্যে আটটি বিমানবন্দর তৈরির লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী। কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য যদি সত্যিই সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। বাংলার আকাশপথ যত বিস্তৃত হবে, ততই বিস্তৃত হবে অর্থনীতির পরিসর। এখন প্রয়োজন দ্রুত কাজ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতা। ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারলেই এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের নতুন উড়ান হয়ে উঠতে পারে।




