• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 21 September, 2026

রাশিয়ার তেল, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা

আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখা— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা।

রাশিয়ার তেল, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা

Image: ANI

রাশিয়া থেকে তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’-এ রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আইনে স্বাক্ষরও করেছেন। আইনের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে থাকা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে এসেছে।

আইনটির প্রধান লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি-রপ্তানি থেকে আয় কমানো এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর চাপ সৃষ্টি করা। আমেরিকার আইনপ্রণেতাদের যুক্তি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ক্রেতারা মস্কোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং সেই অর্থ যুদ্ধ পরিচালনায় কাজে লাগছে। সেই কারণেই শুধু রাশিয়াকে নয়, রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অন্যান্য দেশকেও চাপের মধ্যে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই আইনটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে— সেনেটে ৮৬-১১ এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ২৬২-১৫৯ ভোটে।

কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেবল আন্তর্জাতিক কূটনীতির নয়, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যসীমার ফলে তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফলে হঠাৎই সেই সরবরাহ কমে গেলে ভারতকে অন্য উৎস থেকে তেল কিনতে হতে পারে, যার দাম ও পরিবহন খরচ ভিন্ন হতে পারে।

ভারত অবশ্য বারবার বলেছে, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণই তার প্রধান দায়িত্ব এবং ভারত বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। এই অবস্থানকে শুধু রাশিয়ার প্রতি বিশেষ পক্ষপাত হিসেবে দেখলে ভারতের বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যাটি উপেক্ষিত হয়। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বিদ্যুৎ এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপরও।

তবে এর অন্য একটি দিকও আছে। ভারত-মার্কিন সম্পর্ক গত কয়েক দশকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক গভীর হয়েছে। সেই সম্পর্কের মধ্যেই যদি রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়, তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে। ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাস্তবে কতটা শুল্ক, কোন পণ্যের উপর এবং কখন তা কার্যকর হবে— এসব বিষয় মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।

এখানেই ভারতের কূটনীতির বড় পরীক্ষা। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখা— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু একটি দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে গিয়ে যদি বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও দামেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব কেবল লক্ষ্যবস্তু দেশের উপর সীমাবদ্ধ থাকে না। ভারত তাই এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনায় না গিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার পথেই নিজের স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে।

ভারতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ— কোনও পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে নিজের জাতীয় স্বার্থকে স্পষ্টভাবে রক্ষা করা। বহুমুখী জ্বালানি-সরবরাহ, কূটনৈতিক সংলাপ এবং বিকল্প বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাই এই অনিশ্চিত সময়ে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।