• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 17 September, 2026

জঙ্গলের পথ পেরিয়ে ভুলে-যাওয়া কেরলের আদিবাসী জনপদে পৌঁছেছিলেন যে সাংবাদিক

৩৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন সাম্বান। তিনি পশ্চিমঘাটের গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুথুভান আদিবাসীদের বসতিগুলিতে

জঙ্গলের পথ পেরিয়ে ভুলে-যাওয়া কেরলের আদিবাসী জনপদে পৌঁছেছিলেন যে সাংবাদিক

Image: SNS

ছয় বছরের কার্তিকের কফিন নিয়ে ঘন অন্ধকার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছিল একদল মানুষ। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি পড়ছিল। চারদিকে ছিল বুনো হাতি ও বাইসনের ক্রমাগত হামলার আশঙ্কা। কয়েকজন মানুষ সামনে এগিয়ে গিয়ে পথ ভালো করে দেখে নিচ্ছিলেন, তারপর শোকযাত্রীদের এগিয়ে যাওয়ার সংকেত দিচ্ছিলেন। কুডাল্লারকুড়িতে কার্তিকের বাড়িতে পৌঁছতে সময় লেগেছিল পাঁচ ঘণ্টা। সাংবাদিক আর. সাম্বানের (R. Samban) কাছে এই যাত্রাই তাঁর ইদামালাকুড়ি-সংক্রান্ত সাংবাদিকতার মূল সত্যটিকে তুলে ধরেছিল।

কেরলের একমাত্র আদিবাসী পঞ্চায়েত ইদামালাকুড়িতে কোনও মানুষ হাসপাতালে পৌঁছতে পারবেন কি না, কোনও শিশু স্কুলে যেতে পারবে কি না, কিংবা কোনও পরিবার ন্যূনতম সরকারি পরিষেবা পাবে কি না—অনেকটাই নির্ভর করে তারা কতটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করছে তার উপর।

আরও পড়ুন: ‘দ্য স্টেটসম্যান রুরাল রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫‘-এর দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন জ্যোতি যাদব

৩৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন সাম্বান (R. Samban) । তিনি পশ্চিমঘাটের গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুথুভান আদিবাসীদের বসতিগুলিতে। প্রায় ১০৬ বর্গকিলোমিটার ঘন জঙ্গলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই বসতিগুলি। জনযুগম ডেইলিতে প্রকাশিত তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদনের নাম ছিল ‘হাফ-ব্লুমড ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার্স’—অর্থাৎ ‘আধফোটা বুনো ফুল’। সাম্বান (R. Samban) দ্য স্টেটসম্যান (The Statesman)-কে বলেছিলেন, এই নামটি এমন কিছু মানুষের জীবনের প্রতীক, যাঁদের সম্ভাবনা বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য এবং অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর কারণে পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি।

কার্তিকের মৃত্যু ছিল এর অন্যতম মর্মস্পর্শী উদাহরণ। তার সামান্য জ্বর হয়েছিল, কিন্তু কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল ছিল না, ছিল না চলাচলের উপযুক্ত কোনও রাস্তা। অসুস্থ ও দুর্বল কার্তিককে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় মানকুলাম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে তাকে আদিমালি তালুক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই তার মৃত্যু হয়।

সাম্বান (R. Samban) তাঁর প্রতিবেদনে দেখেছেন, কার্তিকের এই মর্মান্তিক ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এখনও গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর পথ পাড়ি দিতে হয়। তাঁদের কেউ কেউ এখনও ঐতিহ্যগত ঋতুস্রাব ও প্রসবের জন্য ব্যবহৃত কুঁড়েঘরেই সন্তান প্রসব করেন। এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় মহিলা ও শিশুদের। ইদামালাকুড়ির ১০টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দু’টি চালু রয়েছে। আর অ্যাম্বুল্যান্সও সব বসতিতে পৌঁছতে পারে না।

আরও পড়ুন: ‘দ্য স্টেটসম্যান রুরাল রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ডস’ ২০২৫-এ প্রথম পুরস্কার পেলেন দীপ্তি রাউত, ‘কুশরো ইরানি পুরস্কার’ পেলেন রেজি জোসেফ

তবে সাম্বানের (R. Samban) সাংবাদিকতা শুধু বঞ্চনা ও অভাবের কথাই বলে না। তিনি (R. Samban) মুথুভান মানুষের মর্যাদা, তাঁদের লড়াই করে টিকে থাকার ক্ষমতা এবং তাঁদের নানা আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসা তাঁদের জীবনযাত্রার কথা—যে জীবন একসময় জঙ্গলের সম্পদ, ধান, রাগি, বিভিন্ন ধরনের বাজরা, বুনো ফল, মাছ এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল।

বুনো প্রাণীর আক্রমণ, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং জীবিকার পরিবর্তনের ফলে তাঁদের সেই স্বনির্ভর জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর বর্ষাকালে খারাপ রাস্তা এবং ফুলে-ফেঁপে ওঠা নদী-নালা ও ঝরনা এখনও বসতিগুলিকে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

সাম্বানের (R. Samban) প্রতিবেদন কেরলের বহুল প্রশংসিত উন্নয়নের ধারণাকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ইদামালাকুড়িতে মহিলাদের সাক্ষরতার ক্ষেত্রে যে পিছিয়ে পড়া এখনও রয়েছে, তাঁর প্রতিবেদনে সেই ব্যবধানও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত ‘হাফ-ব্লুমড ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার্স’ একটি আরও বড় প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়: একটি গোটা সম্প্রদায় যদি সেই সুযোগগুলির নাগাল থেকেই শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, যে সুযোগগুলি অন্যত্র মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নকে কি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বলা যায়?

ধৈর্য ধরে করা মাঠ-পর্যায়ের সাংবাদিকতা এবং আবেগপ্রবণতা ছাড়াই মানুষের প্রতি সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে সাম্বান পরিসংখ্যান ও সরকারি প্রতিশ্রুতির পিছনে থাকা মানুষগুলির একটি মানবিক মুখ তুলে ধরেছেন। ইদামালাকুড়ি এবং সেখানে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের জন্য দ্য স্টেটসম্যান (The Statesman) গর্বের সঙ্গে আর. সাম্বানকে (R. Samban) ‘দ্য স্টেটসম্যান অ্যাওয়ার্ডস ফর রুরাল রিপোর্টিং ২০২৫’- (The Statesman) এর তৃতীয় পুরস্কার প্রদান করছে।