ফের রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভায় নির্বাচনের জন্য জমা পড়ল না কোনো মনোনয়ন। সচিব, যুগ্মসচিব ও অ্যাপেক্স কাউন্সিলের একটি সদস্যপদ ফাঁকা পড়ে থাকলেও কেউই সেই পদের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আসতে রাজি নন।
বুধবার বিকেল পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল। কিন্তু সিএবি সূত্রের খবর, প্রার্থী হিসেবে কোনো মনোনয়নই জমা পড়েনি। এর অর্থ, সচিব, যুগ্মসচিব ও অ্যাপেক্স কাউন্সিলে একটি আসন খালি রেখেই সিএবি চলবে। কী ভাবে চলবে, সে পরের কথা। সিএবি সভাপতি প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, ‘নির্বাচন না হলেও ২৪ সেপ্টেম্বর সিএবি-র বার্ষিক সভা করতে কোনো অসুবিধা নেই’। কিন্তু তা নিয়েও জলঘোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও অনুমোদিত সংস্থা থেকে সিএবি-র বার্ষিক সভায় প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অগাস্টে সিএবি-র বিশেষ সাধারণ সভার আগেও ঠিক একই ভাবে বিভিন্ন জেলা ও অনুমোদিত সংস্থা থেকে একই প্রশ্ন তুলে একই বয়ানে চিঠি দিয়ে সেই সভা বাতিল করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে এ বার সেই চেষ্টা করে লাভ হবে না বলেই দাবি করেছে সিএবি-র শাসক গোষ্ঠি। কারণ, বার্ষিক সভা শুধু নির্বাচনের জন্য ডাকা হয়নি, আরও একাধিক আলোচ্য বিষয় রয়েছে।
তাই নির্বাচন বাতিল করা গেলেও বার্ষিক সভা বাতিল করা যাবে না বলেই দাবি শীর্ষ কর্তাদের। এক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন ফাঁক পদ পূরণের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া হচ্ছে? কেনই বা নির্বাচনে কেউ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিচ্ছেন না?
এর আগে যখন যুগ্মসচিব পদে নির্বাচন করতে চেয়ে সিএবি বিশেষ সাধারণ সভা ডাকে সিএবি, তখনও বিভিন্ন জেলা সংস্থা ও ক্লাবের পক্ষ থেকে এই সভায় প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং তাতে বলা হয়েছিল, সংস্থায় পদাধিকারী হিসেবে ন’বছর কাটিয়ে যাওয়া বা সত্তরোর্ধ কোনো ব্যক্তি সিএবি-র সাধারণ সভায় অংশ করতে পারবেন না, এমনই বলা আছে বিচারপতি লোঢা আইনে, যে আইন অনুযায়ী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ও তার অনুমোদিত সংস্থাগুলি চলে।
সিএবি-র পাল্টা যুক্তি ছিল, লোঢা আইন অনুসরণ করা হলেও, বোর্ড প্রতিনিধিত্বের এই শর্ত মেনে তাদের সভা করে, তাদের কোনো অনুমোদিত সংস্থাকে সভা করার ক্ষেত্রে এই শর্ত মানতে বাধ্য করে না। এই ব্যাপারে রাজ্য সংস্থাগুলিকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এবং দিল্লি, মুম্বই, ঝাড়খণ্ড, বিদর্ভের মতো ক্রিকেট সংস্থাগুলিতে যোগাযোগ করে জানা যায়, তারাও এই ন’বছর ও সত্তর বছরের শর্ত সভায় প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে আরোপ করে না। গত মাসে ঝাড়খণ্ড ক্রিকেট সংস্থার বার্ষিক সভাতেও এই শর্ত মেনে প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি বলে জানান সেই সংস্থার সচিব সৌরভ তিওয়ারি।
তা হলে সিএবি-র ক্ষেত্রে কেন বারবার এই শর্ত আরোপ করার দাবি জানাচ্ছে সদস্যদের একাংশ? কেনই বা এই শর্ত আরোপ করার দাবি তুলে বারবার সভা বানচাল করার চেষ্টা হচ্ছে?
এক প্রাক্তন সিএবি পদাধিকারীর আশঙ্কা, ‘নির্বাচন এবং বার্ষিক সভা হতে না দিয়ে সিএবি-তে একটা অচলাবস্থা তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে। যাতে ভবিষ্যতে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সিএবি না চলতে পারে এবং অন্য কোনো গোষ্ঠি বাংলার ক্রিকেট শাসনের ক্ষমতা দখল করতে পারে’। অর্থাৎ, বাংলার ক্রিকেটের প্রশাসনে পালাবদলের অশনি সঙ্কেত দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
এর মধ্যে রাজ্যের শাসক দলের মদতও রয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের অনেকের ধারনা। তাঁদের একজন জানালেন, ‘আসন্ন বার্ষিক সভায় রাজ্যের শাসক দলের একাধিক নেতা উপস্থিত থাকবেন বলে মনোনয়নপত্র পাঠিয়েছেন বলে শুনেছি। তাঁদের এই সভায় থাকার অর্থ, রাজ্য ক্রিকেট প্রশাসনে তাঁরা জড়িয়ে থাকতে চান’। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সম্ভবত সৌরভ শিকদার, সজল ঘোষ, রীতেশ তিওয়ারি-দের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিরা আসন্ন বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন পাঠিয়েছেন।
জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলির তরফ থেকে একাধিক জেলাশাসকও উপস্থিত থাকবেন সেই সভায়। অর্থাৎ, শাসক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি থাকবে ভরপুর। এর অর্থ ক্রিকেট প্রশাসনের রাজনীতিকরণ হতে পারে, যেমন বিগত সরকারের সময়েও ছিল। সেই ধারাবাহিকতা এই সরকারের সময়েও বজায় থাকবে কি না, সেটাই দেখার।
বুধবার একটি সংবাদপত্রে সিএবি-র এক শীর্ষকর্তা মন্তব্য করেছেন, ‘রাজ্য সরকারের শীর্ষমহল থেকে আপাতত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় না যাওয়ার বার্তা এসেছে। আমরা জানি না যে ফাঁকা পদগুলিতে এখনই নির্বাচন করা সম্ভব হবে কি না’। এই মন্তব্য যদি সত্যি হয়, তা হলে রাজনীতিকরণের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো এই কারণেই বারবার নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেও কোনো প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে নির্বাচনই হওয়ার নয়, সেখানেই প্রার্থীই বা কোথা থেকে পাওয়া যাবে?




