দিল্লিতে যখন ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে গোটা বিশ্বের নজর ভারতের দিকে। তখনও এই জোটে ঢোকার অপেক্ষাতেই থেকে গিয়েছে পাকিস্তান। তিন বছর আগে আবেদন করেও মেলেনি সদস্যপদ। চিনের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করা হলেও ভারতের আপত্তিই পাকিস্তানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টাও চালিয়েছে পাকিস্তান।
২০২৩ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রক আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আবেদন করার কথা জানিয়েছিল। মন্ত্রকের মুখপাত্র মুমতাজ জহরা বালোচ বলেছিলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলির এই গুরুত্বপূর্ণ জোটে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সব দেশকে নিয়ে কাজ করার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চায় ইসলামাবাদ। ব্রিকসের অধিকাংশ সদস্য দেশের সঙ্গেই পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছিল।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিনকে নিয়ে ২০০৬ সালে ব্রিকস গড়ে উঠেছিল। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর জোটটি আরও বিস্তৃত হয়। ২০২৪ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি পূর্ণ সদস্য হওয়ায় ব্রিকসের পরিধি আরও বেড়েছে। সৌদি আরবকেও সদস্যপদের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ২০২৫ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়াও জোটের সদস্য। বর্তমানে আরও ২৯টি দেশ ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।
ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সব সদস্য দেশের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চিন বা রাশিয়ার সমর্থন থাকলেও ভারতের আপত্তি কাটিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে জোটে প্রবেশ করা কঠিন। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত টানাপোড়েনের কারণেই দিল্লি ইসলামাবাদের আবেদনে সায় দিচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ভারত সরকার পাকিস্তানের আবেদন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
পাকিস্তানের ব্রিকসে যোগ দেওয়ার পিছনে শুধু কূটনৈতিক কারণ নয়, বড় অর্থনৈতিক হিসাবও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকা ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক অর্থের নতুন উৎস খুঁজছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, সে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৩.৭ শতাংশ। ব্রিকসের সঙ্গে যুক্ত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কে পাকিস্তান ৫৮ কোটি ডলারের অংশীদারি কিনেছে বলে এশিয়ার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থের জোগান তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
ব্রিকসে ঢুকতে পারলে সদস্য দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগও বাড়বে বলে মনে করছে ইসলামাবাদ। কারণ, ব্রিকসের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। সম্প্রসারিত জোটের সদস্য দেশগুলির হাতে বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ জনসংখ্যা রয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশও এই দেশগুলির। ফলে জোটটি এখন শুধু রাজনৈতিক আলোচনা বা কূটনীতির মঞ্চ নয়, বড় অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রও। এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যও বেড়েছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে ব্রিকস দেশগুলিতে ভারতের রপ্তানি ৪৮.৮ শতাংশ বেড়ে ৬৪.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯৫.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন: ৬ বছর পর আকাশপথে জুড়ছে ভারত-চিন, দিল্লি-ওয়াংঝু রুটে ফিরছে চায়না সাদার্ন
এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধার আশায় ব্রিকসে প্রবেশ করতে চাইছে পাকিস্তান। কিন্তু চিনের সমর্থন থাকলেও ভারতের সম্মতি ছাড়া সেই দরজা খোলার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।




