নিয়োগপত্রে লেখা থাকল মুম্বাই আদালতের এক্তিয়ার। কিন্তু কর্মস্থল যদি হয় পশ্চিমবঙ্গ আর সেই কর্মস্থলেই যদি শ্রমবিরোধের সূত্রপাত, তাহলে শুধুমাত্র চুক্তির শর্ত দেখিয়ে বাংলার শিল্প-ট্রাইব্যুনালের দরজা বন্ধ করা যাবে না। এমনই তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট।
বিচারপতি রাই চট্টোপাধ্যায়ের একক বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, নিয়োগপত্রে নির্দিষ্ট কোনও আদালত বা ফোরামের একচেটিয়া এক্তিয়ার নির্ধারণ করে দেওয়া থাকলেও তা আইন দ্বারা সৃষ্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাইব্যুনালের বিধিবদ্ধ ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে না। শিল্প-ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা কোনও ব্যক্তিগত চুক্তি থেকে নয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপুটস অ্যাক্ট, ১৯৪৭ (Industrial Disputes Act, 1947)-এর অধীনে সরকারের করা রেফারেন্স থেকেই আসে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, মুম্বাইয়ের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা আইসিপি হেলথ প্রোডাক্ট লিমিটেড এ ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তপন চট্টোপাধ্যায়কে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ পদে নিয়োগ করে। নিয়োগপত্র মুম্বাই থেকে জারি হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, চাকরির চুক্তি সংক্রান্ত কোনও বিরোধ হলে মুম্বাইয়ের আদালতেই মামলা হবে। পরবর্তী সময়ে তপনবাবুর কর্মস্থল হয় পশ্চিমবঙ্গ।
২০১০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শুরু হয় প্রাথমিক তদন্ত। পরে আটটি অভিযোগে চার্জশিট দেওয়া হয়। কর্মীর অভিযোগ ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের স্থান মুম্বাই করা হলেও তাঁর সাক্ষীরা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। তাই বাংলাতেই তদন্ত করার আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, তদন্তে ব্যবহৃত অভিযোগ ও রিপোর্টের কপি না দেওয়া, নিজের পছন্দের প্রতিনিধির সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা-সহ একাধিক প্রক্রিয়াগত আপত্তিও তুলেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের ২৪ মার্চ তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। অথচ দ্বিতীয় শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য তিনি ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময় চেয়েছিলেন।
এরপরই শ্রমদপ্তরের দ্বারস্থ হন তপনবাবু। সমঝোতা ব্যর্থ হলে মামলা যায় পশ্চিমবঙ্গের ৭ নম্বর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাইব্যুনালে। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ ট্রাইব্যুনাল জানায়, মামলাটি শোনার আঞ্চলিক এক্তিয়ার তাদের রয়েছে। সেই সঙ্গে বিভাগীয় তদন্তকে বেআইনি ঘোষণা করে তপনবাবুকে পুনর্বহাল এবং সম্পূর্ণ বকেয়া বেতন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে যায় সংস্থা।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, কর্মীর প্রকৃত কর্মস্থল এবং যেখানে শিল্পবিরোধের মূল সূত্রপাত সেই জায়গার সঙ্গে বিরোধের বাস্তব যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সংস্থার রেজিস্টার্ড অফিস মুম্বাইয়ে কিংবা নিয়োগপত্র মুম্বাই থেকে বেরিয়েছিল, এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিরোধের যোগ অস্বীকার করা যায় না।
২০১২ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে শিল্প-ট্রাইব্যুনালগুলির আঞ্চলিক এক্তিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিজ্ঞপ্তির দোহাই দিয়ে ৭ নম্বর ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে গোড়া থেকেই ‘শূন্য’ বলে দেওয়া যাবে না বলেও জানায় আদালত। কারণ, ট্রাইব্যুনাল নিজেই এক্তিয়ার নিয়ে আপত্তি শুনে মামলার প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিভাগীয় তদন্তে কর্মীর অংশগ্রহণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে আদালত।
বিচারপতির বক্তব্য, কোনও তদন্তে কর্মী অংশ নিয়েছেন বলেই তাঁর সমস্ত প্রক্রিয়াগত আপত্তি মেনে নেওয়া হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে তদন্তের স্থান, পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নথি না দেওয়ার মতো বিষয়ে যদি কর্মী সেই সময়েই আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তা হলে পরে সেই আপত্তি তোলার অধিকার তাঁর থাকে।
বরখাস্তের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও আদালত ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে হস্তক্ষেপের কারণ দেখেনি। ট্রাইব্যুনালই ছিল প্রাথমিক তথ্য-নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ এবং তার সিদ্ধান্ত যে কোনও প্রমাণহীন বা অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে, এমন কিছু দেখাতে পারেনি সংস্থা। তবে সেই সঙ্গে হাইকোর্ট সতর্ক করেছে, বেআইনি বরখাস্ত হলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে পুনর্বহাল ও সম্পূর্ণ বকেয়া বেতন দিতে হবে, এমন কোনও সার্বজনীন নিয়ম নেই। মামলার পরিস্থিতি বিচার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিকার নির্ধারণ করতে হবে।
এই মামলায় অবশ্য কর্মী বরখাস্তের পর আর কোনও চাকরি বা উপার্জনে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছিলেন। সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করার মতো কোনও নির্দিষ্ট তথ্যও সংস্থা আদালতের সামনে দেখাতে পারেনি। ফলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আর্থিক প্রতিকারের ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখেনি হাইকোর্ট। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির কথাও জানিয়েছে আদালত।
মামলা চলাকালীন কোনও কর্মীর অবসরের বয়স পেরিয়ে গেলে তাঁকে বাস্তবে ফের চাকরিতে বসানো আর সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে তাঁকে অবসরের দিন পর্যন্ত চাকরিতে বহাল ছিলেন বলে ধরে নিয়ে প্রাপ্য বেতন, অবসরকালীন সুবিধা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়াই উপযুক্ত প্রতিকার। তবে ইতিমধ্যে পাওয়া অর্থ, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ বা ধারা ১৭বি-এর অধীনে পাওয়া টাকা হিসাব করে তা সমন্বয় করতে হবে।
আরও পড়ুন: ‘বিয়ে বৈধ কি না, তা দিয়ে নির্যাতনের বিচার থমকে যাবে না’, নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের
নিয়োগপত্রে ‘মুম্বাই আদালতই শেষ কথা’ লেখা থাকলেও কর্মস্থল বাংলায় হলে শ্রমিকের আইনি লড়াইয়ের পথ স্রেফ চুক্তির একটি শর্তে বন্ধ করা যাবে না। এই মামলায় সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করল কলকাতা হাইকোর্ট।




