• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 8 September, 2026

কর্মজীবনে মাতৃত্ব

আমাদের সমাজে এখনও সংসার ও সন্তানের দায়িত্বকে অনেকাংশে নারীর একার দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। ফলে একজন নারী মা হওয়ার পর তাঁর কর্মজীবনের প্রতি আগের মতো দক্ষতা ও মনোযোগ থাকবে কি না, সেই প্রশ্নটি খুব সহজেই উঠে আসে

কর্মজীবনে মাতৃত্ব

Image: AI নির্মিত

একজন নারীর জীবনে মা হয়ে ওঠার মুহূর্তটি যেমন গভীর আনন্দের, তেমনই তা জীবনের এক বড় পরিবর্তনের সূচনা। কিন্তু সেই নারী যদি কর্মজীবী হন, তবে মাতৃত্বের সঙ্গে কখনও কখনও জুড়ে যায় আর-একটি অদৃশ্য আশঙ্কা— সন্তানের জন্য কিছুদিন কাজ থেকে দূরে থাকলে ফিরে এসে কি তিনি তাঁর আগের জায়গাটি আর খুঁজে পাবেন? এই প্রশ্নটি অমূলক নয়। বরং আমাদের কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা মাঝেমধ্যেই তাকে নির্মমভাবে সত্য করে তোলে।

সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টের একটি রায় সেই বাস্তবতার দিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, গর্ভাবস্থা কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনও কর্মীকে পদাবনতি দেওয়া বা তাঁর মর্যাদা কমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। কথাটি শুনতে খুবই স্বাভাবিক। অথচ এই স্বাভাবিক অধিকারটির কথা মনে করিয়ে দিতে আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছে— এটাই উদ্বেগের।

মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনও অনুগ্রহ নয়। কোনও প্রতিষ্ঠানের দয়া নয়। এটি নারীর আইনস্বীকৃত অধিকার। সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একজন নারী কিছুদিন কাজ থেকে বিরত থাকবেন— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিক বিরতিকে যদি তাঁর পেশাগত জীবনে শাস্তিতে পরিণত করা হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা আসলে কতটা আধুনিক কর্মসংস্কৃতি তৈরি করতে পেরেছি?

কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য সব সময় প্রকাশ্য হয় না। কখনও তা আসে নীরবে, কাগজপত্রের আড়ালে। ছুটি থেকে ফিরে কোনও নারী হয়তো দেখলেন, তাঁর আগের দায়িত্বটি আর তাঁর নেই। তাঁকে এমন একটি পদে বসানো হয়েছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম, কাজের গুরুত্ব কম, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও কম। কখনও পদোন্নতি পিছিয়ে যায়, কখনও বেতনবৃদ্ধি থেমে থাকে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে ভিতরে একজন নারীর পেশাগত যাত্রাপথটি বদলে যায়।আর এখানেই সমস্যাটি আরও গভীর।

আমাদের সমাজে এখনও সংসার ও সন্তানের দায়িত্বকে অনেকাংশে নারীর একার দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। ফলে একজন নারী মা হওয়ার পর তাঁর কর্মজীবনের প্রতি আগের মতো দক্ষতা ও মনোযোগ থাকবে কি না, সেই প্রশ্নটি খুব সহজেই উঠে আসে। অথচ সন্তান তো শুধু মায়ের নয়, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎও তার সঙ্গে জড়িত। তাই মাতৃত্বকে নারীর ব্যক্তিগত বোঝা হিসেবে দেখা এবং তার জন্য তাঁকে কর্মক্ষেত্রে মূল্য দিতে বাধ্য করা— দুই-ই অন্যায়।

বিভিন্ন সমীক্ষা এই উদ্বেগের বাস্তব ছবিও তুলে ধরেছে। বহু কর্মজীবী মা জানিয়েছেন, সন্তান জন্মের পর কাজে ফিরে তাঁদের কর্মজীবনের গতি কমে গেছে। কেউ আগের দায়িত্ব হারিয়েছেন, কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কেউ আবার এমন কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন যা তাঁর পছন্দ বা যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থাৎ আইনে যে ছুটি নারীর সুরক্ষার জন্য, বাস্তবে সেটিই কখনও কখনও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি বদলাতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি এবং তার কঠোর প্রয়োগ। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে একজন নারী যেন তাঁর আগের পদ, দায়িত্ব, বেতন ও পেশাগত মর্যাদা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরতে পারেন, তার নিশ্চয়তা থাকা দরকার। কোথাও বৈষম্য ঘটলে অভিযোগ জানানোর এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে।তবে আইনের চেয়েও বড় হল মানসিকতার পরিবর্তন।

একজন নারী মা হয়েছেন বলে তাঁর মেধা কমে যায় না, অভিজ্ঞতা মুছে যায় না, পেশাগত দক্ষতাও হারিয়ে যায় না। বরং যে কর্মক্ষেত্র একজন নারীকে তাঁর জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পাশে দাঁড়াতে পারে, সেই কর্মক্ষেত্রই প্রকৃত অর্থে মানবিক ও আধুনিক।নারীকে যদি প্রতিনিয়ত এই ভয় নিয়ে বাঁচতে হয় যে মাতৃত্ব তাঁর পদোন্নতির পথে বাধা হবে, তাঁর বেতন কমবে, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ অন্যের হাতে চলে যাবে— তবে কর্মক্ষেত্রে

সমতার কথা বলা নিছক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়। মাতৃত্ব কোনও অপরাধ নয়, কোনও দুর্বলতাও নয়। তাই একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য তাঁর কর্মজীবনের মূল্য দিতে হবে— এমন সংস্কৃতি বদলাতেই হবে। আইন সেই অধিকার দিয়েছে, এখন কর্মক্ষেত্রকে সেই অধিকারের মর্যাদা দেওয়ার সময়।