ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জটিল। দেশের একদিকে মায়ানমার, অন্যদিকে আফগানিস্তান ও তার আশপাশের অঞ্চল— যেগুলি ঐতিহাসিকভাবে মাদক উৎপাদন ও পাচারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মায়ানমার সীমান্তের বিস্তীর্ণ ও দুর্গম ভূ-প্রকৃতি নজরদারিকে কঠিন করে তোলে।
ফলে সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পাচার বন্ধ করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত এবং প্রয়োজনীয়।
মাদকবিরোধী অভিযানে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে চার স্তরের NCORD ব্যবস্থা চালু করে কেন্দ্র, রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার কাঠামো তৈরি করা হয়। বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ অ্যান্টি-নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স গঠন এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে তাদের সমন্বয় মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে।
এর ফলে মাদকবিরোধী লড়াই আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অভিযান বা ছোটখাটো মাদক উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বড় মাদকচক্র, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ, পাচারের পথ এবং তাদের আর্থিক নেটওয়ার্ক—সবকিছুকে একসঙ্গে চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে। ‘NIDAN’-এর মতো জাতীয় ডেটাবেস এবং CCTNS-এর তথ্য ব্যবহার করে মাদকচক্রের গতিবিধি, হটস্পট, পাচারের পদ্ধতি ও বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের তথ্য বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা এই লড়াইকে আরও তথ্যনির্ভর করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শুধু মাদক উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। মাদকের অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সেটিও খুঁজে বের করা জরুরি। তাই হাওয়ালা, বেনামি সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং অপরাধলব্ধ অর্থের বিরুদ্ধে আর্থিক তদন্তকে মাদকবিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রমাণ করে যে প্রশাসন মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডেও আঘাত করতে চাইছে।
তবে মাদকবিরোধী লড়াই শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং নাগরিক সংগঠনগুলিকেও যুক্ত হতে হবে। কারণ মাদকের চাহিদা কমানো না গেলে শুধু সরবরাহ বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া কঠিন। আসক্ত তরুণদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।‘নেশামুক্ত ভারত ২০২৯’ তাই শুধু একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। সরবরাহ কমানো, মাদকের চাহিদা কমানো এবং ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ— এই তিনটি দিককে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা সঠিক পথেই এগোনোর ইঙ্গিত দেয়।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই দীর্ঘ এবং কঠিন। কিন্তু সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তি, আর্থিক তদন্ত এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে সাফল্য অবশ্যই সম্ভব। একটি শক্তিশালী, সুস্থ ও নেশামুক্ত তরুণ প্রজন্মই ভারতের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষার লক্ষ্যে ‘নেশামুক্ত ভারত ২০২৯’-এর উদ্যোগকে তাই সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া উচিত।




