রাজনীতি মানেই ক্ষমতার গদিতে বসা। আর একবার গতি পেলে কংগ্রেস, কম্যুনিস্ট, সোস্যালিস্ট, এমনকি বিজেপি’র মতো ‘জাতীয়তা’র মুখোশ পরা দলও ক্ষমতার সীমা বাড়াতে বাড়াতে পুরো গণতন্ত্রকেই প্রায় গ্রাস করতে চায়! অথচ মুখে গণতন্ত্রের বুলি আউড়ে চলে সবাই।
ব্রাত্য বসুর লেখা নাটক ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ আমেরিকার বিশ বছর ঘুমিয়ে থাকা রিপ ভ্যানের অকস্মাৎ জেগে উঠে তার পরিবর্তিত চারপাশ দেখে থমকে ও চমকে যাওয়ার কাহিনিকেই এই রাজ্যের কংগ্রেস-বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন এবং মস্তান নিয়ন্ত্রিত তৃণমূল কংগ্রেস দলের উত্থান নিয়ে। ফিল্ম পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় সেই ২০০২ সালের নাটকটি নিয়ে আজকের ২০২৬ সালে সত্যিই এক সাহসী ইন্টারপ্রিটেশন দিলেন বাংলা সিনেমার পর্দায়। এভাবে দলের এবং দলনেতাদের নাম করে করে রাজনৈতিক ডিসকোর্স বাংলা সিনেমায় দর্শকরা সম্ভবত প্রথম দেখবেন। মঞ্চে অবশ্যই দেখেছি এবং সেসব দেখে কাগজের সমালোচকরাই অনেক সময়ই বলেছেন চলতি রাজনীতি নিয়ে সিনেমা বানানোর ‘সাহস’ নেই কারও এই এখনকার কলকাতায়। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’কে সার্থকভাবে পর্দায় এনে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান বুঝিয়ে দিলেন রাজনীতির জ্বলন্ত আগুনের গোলাটি তাঁরা দর্শকের কাছে সেন্সরের বাধানিষেধ পেরিয়েও আনতে পারলেন। এবার দর্শকের পরীক্ষা— তাঁরা গুপ্তধন রহস্য, গোয়েন্দা কাহিনী বা ঢলোঢলো প্রেমের কাহিনী সরিয়ে নিজেদেরই আয়নায় নিজের মুখ দেখতে চান কিনা! তারই ওপর নির্ভর করছে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ।
নাটকের মূল বক্তব্য থেকে কিছুমাত্র সরে যাননি সৃজিৎ। সিনেমার পর্দায় সব্যসাচীর ২৬ বছরের ‘ভাতঘুম’ থেকে হঠাৎ জেগে উঠে চারদিকের পরিবর্তন দেখে বিস্মিত ‘নাটকীয়’ হয়ে ওঠার মানসিকতা, পরিবর্তন, বিবর্তনকে অতীত আর বর্তমানে বারবার মসৃণতার সঙ্গে এগিয়ে-পিছিয়ে মূল কাহিনির সঙ্গে সুন্দরভাবে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। ভারী সিনেমাটিক মজায় সব্যসাচীর (ঋত্বিক চক্রবর্তী) বয়স্কা স্ত্রী অনসূয়া (অনসূয়া মজুমদার) চরিত্রের দুই বয়সের দুই অভিনেত্রীকে (সোহিনী সরকার) একই ফ্রেমে এনেছেন একাধিকবার। কোনও জার্ক লাগে না দর্শকের চেতনায়। দলের পুরনো সহকর্মী ও কমরেড সনৎ (দেবেশ চট্টোপাধ্যায়), রাজেন (সত্রাজিৎ সরকার)-দের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার বাদানুবাদে এই রাজ্যের প্রাক্তন প্রধান শাসক দলের অভ্যন্তরীণ জটিলতা স্পষ্ট হয়। চিন, নাকি সোভিয়েত রাশিয়ার লাইনে চলবে সিপিএমের গাড়ি, নাকি তাকে মাটি আর মানুষের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এগোতে হবে! গলতিটা কোথায় ঘটে গেল তা নিয়ে দীর্ঘ ডিসকাশন বা রাজনৈতিক ডিসকোর্স এই ছবির প্রাণবিন্দু। ছবিতে কাল্পনিকভাবে লেনিন ও স্ট্যালিনের সঙ্গে সব্যসাচীর দেখা হওয়া এবং কিছু সংলাপ বিনিময়ও আছে। এই দু’টি দৃশ্যের পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবে পরিচালকদের রাজনৈতিক ভাবনার কিঞ্চিৎ প্রতিফলন।
তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আত্মজ ইন্দ্রর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে ফিরে আসা বাবার রাজনৈতিক আলাপচারিতা, বিতণ্ডা এবং প্রায় সম্মুখ সমরে দাঁড়িয়ে দু’জনের মত বিনিময়ের শেষ দৃশ্যটি। শুরু থেকেই বাবার কম্যুনিস্ট পার্টি করা নিয়ে ইন্দ্রর বিরোধিতা ছিল। সে এখন তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী হয়েও দলের পুরো বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠতে পারেনি। কম্যুনিস্ট বাবার অতর্কিত ফিরে আসাটাও একটা বড় কারণ বইকি। সেই জন্যও বাবার বিরোধিতা তার। সে সুবিধাবাদীপন্থী আজকের বিভ্রান্ত যুব-সমাজের মতো। যে বলতে পারে, ‘হ্যাঁ, আমি তৃণমূল কংগ্রেস করি, করবও। আবার দরকার হলে বিজেপি করব।’
বাবা সব্যসাচী সন্তানের এই রাজনৈতিক স্খলনকে মেনে নিতে পারেন না। তারা মুখোমুখি হয় খাবার টেবিলে মা-বোনের (অঙ্গনা রায়) সঙ্গে। সেখানেও বৃদ্ধা স্ত্রী ছোটবোন নিরস্ত করতে চায় দু’জনকেই, হয় না। এই পর্বগুলিই ছবির রাজনৈতিক ভাষ্যের ডিসকোর্স। অবশ্যই সাধারণ দর্শক এগুলোকে কীভাবে নেবেন, বলা মুশকিল।
এই ছবির শরীরে, একাধিক দৃশ্যে সৃজিৎ জড়িয়ে দিয়েছেন আধুনিক প্রযুক্তি মেশানো সিনেমার ব্যাকরণও। দেখতে বেশ লাগে স্বপ্নের মধ্যে খানিকটা যেন মশারির মধ্যে থেকে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা সব্যসাচী চারদিকের নানা বদল দেখতে পায়। ক্যামেরা সার্কুলার ট্রলিতে ঘোরে। যেমন সে চমকে যায় মোবাইল ফোন, টিভি সিরিয়ালের উত্তরণ বা অবতরণের কথা শুনে। তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া ছাব্বিশটা বছর বিভিন্ন চরিত্র তো বটেই, স্ত্রী অনসূয়া, মেয়ে এবং ছেলে ইন্দ্রর মাধ্যমে জানতে পারে। আরও বেশি হতাশায় ডুবে যায়। কিন্তু মানসিকভাবে হারে না। স্ত্রী ও কন্যা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেও ইন্দ্র মনে করে কম্যুনিস্ট বাবার অতর্কিত আবির্ভাব তাঁর জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যাঁকে সে ‘বাবা’ বলে স্বীকারই করতে চায়নি— শেষ দৃশ্যের চরম মুহূর্তে তাঁর মুখেই ফিরে আসে ‘বাবা!’ সম্বোধন। কেন, কীভাবে সেটি ঘটল, এখানেই রয়েছে ছবিটি রিপ ভ্যান উইঙ্কল-এর শীতঘুমকেই কোথায় যেন ব্যঙ্গ করে যায়।
ছবির কাঠামোয় দুই চিত্রনাট্যকার সৃজিত ও পদ্মনাভ দাশগুপ্ত বেশ কয়েকটি গানও ব্যবহার করেছেন। আগের দিনের মতো গান আর এখন প্রমোদ উপাদানের চাইতে ছবির বক্তব্য, চরিত্রের মানসিক যন্ত্রণা ও দ্বন্দ্বের প্রতীক বেশি হয়ে ওঠে। কম্যুনিস্ট দলের স্লোগানধর্মী গানগুলো তো আছেই। বাড়তি মাত্রা এনে দেয়— ‘হারিয়েছে অচেনা সুখ…’, ‘যে আঁধারে এসেছিলে চুপিচুপি তাকে সাজাই…’ ছবির হৃদপিণ্ডের মতো। এবং সর্বশেষে নজরুলের ‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট…’ কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক শাসনের বিপরীতে বিপ্লবের কথাই উচ্চারণ করে না! এমন উচ্চারণ আমরা প্রথম শুনেছিলাম ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’তে। এবার দেখলাম, শুনলাম ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ সিনেমায়। প্রবুব্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবহ এই ছবির অলংকার। আর ঋত্বিক, পরমব্রত, অনসূয়া, রজতাভ দত্ত, অঙ্গনা, দেবেশ, সত্রাজিৎ— এমনকি প্রায় নির্বাক থেকে সোহিনীও মন ভরানো অভিনয় দিয়ে চরিত্রগুলো বিশ্বাস্য করেছেন, প্রাণদান করেছেন! তাঁদের সব্বাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। অভিনন্দন প্রাপ্য ফ্রেন্ডস কম্যুনিকেশনের ফিরদৌসুল হাসানের। যিনি ‘কর্পূর’-এ লগ্নি করেন যে কারণে, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এ নিশ্চয়ই একই কারণে নয়!




