উত্তমকুমার বাঙালির কাছে এক পূর্ণ নায়ক। স্বাধীনতা ও দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের উদ্বাস্তু জীবন, দাঙ্গা, ছিন্নমূল অস্তিত্বের অন্ধকার পেরিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যে নায়ক-ইমেজ তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিলেন উত্তমকুমার (Uttar Kumar)। প্রেমিক, স্বামী, নাগরিক যুবক, বিষণ্ণ পুরুষ—বিভিন্ন ভূমিকায় নির্মিত তাঁর নায়কসত্তা দর্শকের মনে প্রায় স্বতন্ত্র এক পরিচয় তৈরি করেছিল। সেই পরিচিত উত্তমকুমারকেই (Uttar Kumar) ১৯৭৭-এর ‘সব্যসাচী’ ছবিতে দেখা যায় একেবারে অন্য অবয়বে—বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিকের চরিত্রে, আর সেই চরিত্রেরই এক পর্যায়ে ‘গিরিশ মহাপাত্রের’ ছদ্মবেশ। রোগা, রুগ্ণ, কাশিতে জর্জরিত, বিচিত্র সাজসজ্জার এক মানুষ। পরিচিত মহানায়কের চেহারা থেকে এত দূরে এই রূপান্তরই চরিত্রটির অভিনয়গত তাৎপর্যকে বিশেষ করে তোলে।
পীযূষ বোস পরিচালিত ‘সব্যসাচী’ সিনেমা কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে নির্মিত। ১৯৭৭ সালের ২১ জানুয়ারি কলকাতার মিত্র ও প্রিয়া প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির মুক্তি। উষা ফিল্মসের প্রযোজনায় নির্মিত সাদা-কালো এই ছবিটির চিত্রগ্রহণ করেছিলেন বিজয় ঘোষ, সম্পাদনায় ছিলেন বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং শিল্প নির্দেশনার দায়িত্বে সূর্য চট্টোপাধ্যায়। ছবির সংগীত পরিচালনায় ছিলেন উত্তমকুমার নিজেই, সঙ্গে ছিলেন নিদান বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ সব্যসাচী উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁর সংগীত-সত্তারও একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব।
ছবিটির কেন্দ্রে সব্যসাচী মল্লিক—ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী, ‘পথের দাবী’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চোখে এক দুর্ধর্ষ পলাতক। শিক্ষিত, মেধাবী, সাহসী এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের পরিচয় বদলে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই মানুষটির বিরুদ্ধে পুলিশের লড়াই তাই কেবল অস্ত্রের নয়, বুদ্ধিরও। সব্যসাচীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুমিত্রা – রোজ, অপূর্ব, ভারতী, ব্রজেন্দ্র এবং পুলিশ আধিকারিক নিমাই রায়ের মতো চরিত্র। সুপ্রিয়া দেবী অভিনয় করেছেন ‘রোজ’ এবং সুমিত্রার ভূমিকায়, কিরণ লাহিড়ী অপূর্ব, বিকাশ রায় নিমাই রায় এবং অনিল চট্টোপাধ্যায় ব্রজেন্দ্রর চরিত্রে। তরুণ কুমারও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়।
শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গল্প | ১৯২৭ সালে উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করেছিল | রাষ্ট্রের চোখে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল বিপজ্জনক। সেই উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ যখন ১৯৭৭ সালে পর্দায় আসে, তখন তার ঐতিহাসিক পটভূমি বিপ্লবী রোমান্টিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা জনমানসে সঞ্চার করে জাতীয়তাবোধ । সব্যসাচী চরিত্র সেই ইতিহাসকে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করে।
আরও পড়ুন: ‘অরুণ’ আলোয় অজানা উত্তম
কিন্তু এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিসরের মধ্যেও গিরিশ মহাপাত্রের পর্বটি আলাদা করে চোখে পড়ে। কারণ এখানে বিপ্লবী সব্যসাচীকে পর্দায় দেখা যায় নিজের সম্পূর্ণ বিপরীত এক পরিচয়ে। সময়ের বিচারে ফিরে যেতে হয় ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতে। উত্তমকুমার সম্পর্কে দর্শকের যাবতীয় চেনা ধারণার বিপরীতে দাঁড়ানো এই চরিত্রের অভিনয়গত তাৎপর্য এখানেই। গিরিশকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বাঙালির চেতনার আলেখ্য নায়ক উত্তম কুমারকে নিজের তৈরি নায়ক- ভাবমূর্তি আড়াল করতে হয়েছে।
অগ্নিযুগের বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন, গোপন সংগঠন, পুলিশের নজরদারি ও রাষ্ট্রের দমননীতির মধ্যে আত্মগোপন ছিল সংগ্রামের অপরিহার্য কৌশল। সব্যসাচী সেই বিপ্লবী চেতনার প্রতিনিধি—শুধু সাহসী নন, মেধাবী, বিচক্ষণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের পরিচয় বদলে নিতে সক্ষম। ফলে গিরিশ মহাপাত্র নিছক ছদ্মবেশ নয়, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চোখকে বিভ্রান্ত করার এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। যে মানুষটিকে পুলিশ খুঁজছে, তার চেহারা যদি বিপজ্জনক হয়, তবে নিজেকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত করে তোলাই নিরাপদ।

গিরিশ সেই কৌশলের ফল—সাধারণ হয়ে ওঠার এক কঠিন অভিনয়। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদেই প্রথম প্রতারণাটি সম্পূর্ণ হয়। রোগা শরীরের সঙ্গে অদ্ভুত সাজ, বাহারি পোশাক, তেলমাখা চুল, বেমানান জিনিসপত্র, হাতে বিশেষ ধরনের বেত—সব মিলিয়ে এমন এক অবয়ব, যার সঙ্গে শিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিপ্লবী সব্যসাচীর কোনও দৃশ্যমান মিল নেই। উত্তমকুমার এই রূপান্তরকে মেকআপে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শরীরের ভঙ্গি, হাঁটার গতি, বসার ধরন, কাশির ছন্দ—সবকিছুর ভিতর তিনি গিরিশের অসুস্থতাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর পরিচিত ঋজু শরীরী ভাষা ভেঙে গিয়ে নায়কোচিত শরীরই হয়ে উঠেছে ছদ্মবেশের উপকরণ।
কিন্তু রূপান্তরের সবচেয়ে সূক্ষ্ম জায়গাটি তাঁর চোখে। গিরিশের শরীর দুর্বল, কিন্তু দৃষ্টি নয়। মুখে নির্বিষতা, আচরণে অসহায়তা, অথচ দৃষ্টির গভীরে এক অস্বাভাবিক স্থিরতা। শরৎচন্দ্রের চরিত্র-বর্ণনায় গিরিশের চোখ যে গুরুত্ব পায়, উত্তমকুমার সেই চোখকে সরাসরি ‘বিপ্লবীর চোখ’ করে তোলেননি। বরং সেখানে রেখেছেন সামান্য রহস্য—যা দর্শককে বুঝিয়ে দেয়, এই মানুষটি যা দেখাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি কিছু। এই সংযমই অভিনয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করে।
গিরিশ মহাপাত্রের ক্ষেত্রে উত্তমকুমারের (Uttar Kumar) অভিনয় মূলত অভিনয়ের ভিতর অভিনয়। তিনি অভিনয় করছেন সব্যসাচীকে, আর সব্যসাচী অভিনয় করছেন গিরিশকে। এই দ্বিস্তরীয় চরিত্রায়ণে সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল অতিরঞ্জন। সব্যসাচীর বুদ্ধি যদি অতিরিক্ত প্রকাশ পেত, ছদ্মবেশ ভেঙে যেত | আবার গিরিশকে অতিরিক্ত নির্বোধ করলে চরিত্রটি কৃত্রিম হয়ে উঠত। উত্তমকুমার দুই প্রান্তের মাঝখানে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করেন, যেখানে গিরিশ একই সঙ্গে সাধারণ এবং রহস্যময়, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের পর্বগুলিতে এই অভিনয় বিশেষ তাৎপর্য পায়। গিরিশের সঙ্গে পুলিশের আচরণ মূলত তাঁর বাহ্যিক পরিচয়ের উপর নির্ভরশীল। তল্লাশিতে পাওয়া তুচ্ছ ও অদ্ভুত জিনিসপত্র, তাঁর কথাবার্তা এবং অসুস্থ শরীর তাঁকে সম্ভাব্য বিপ্লবীর চেয়ে বরং এক বিচিত্র সাধারণ মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করে। নিমাই রায়ের মতো অভিজ্ঞ পুলিশ আধিকারিকের সন্দেহও সেই বাহ্যিকতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে দুর্বল হয়। রাষ্ট্র যে মানুষটিকে খুঁজছে, তার সঙ্গে গিরিশের কোনও দৃশ্যমান মিল নেই—এই অমিলই শেষ পর্যন্ত ছদ্মবেশের সাফল্য।
এখানে উত্তমকুমারের (Uttar Kumar) কৌতুকবোধও গুরুত্বপূর্ণ। গিরিশকে দেখে দর্শকের হাসি পায়, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে থেকে যায় অস্বস্তি। কারণ দর্শক জানে, এই হাস্যকর মানুষটির পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে বিপজ্জনক পরিণতি। ফলে চরিত্রটি যত নির্বিষ মনে হয়, তার অন্তর্গত বিপ্লবী সত্তা ততই তীব্র হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত অনুভূতিই গিরিশকে নিছক কৌতুকচরিত্রের সীমা অতিক্রম করায়।
গিরিশ চরিত্রে উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় প্রদর্শন আত্ম সংযম । সাধারণত জনপ্রিয় নায়ক পর্দায় নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেন | এখানে উত্তমকুমার (Uttar Kumar) ঠিক তার বিপরীত কাজ করেছেন। নিজের তারকা-সত্তাকে তিনি চরিত্রের আড়ালে সরিয়ে দিয়েছেন। দর্শক তাঁর মুখ চিনেও তাঁকে যেন নতুন করে চিনতে বাধ্য হয়। যে মুখে দর্শক প্রেমিককে চিনত, সেই মুখে তিনি বিপ্লবীর ছদ্মবেশ বসিয়েছেন | যে শরীর পৌরুষের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই শরীরকে করেছেন রুগ্ণ, যে কণ্ঠে ছিল নায়কের দৃঢ়তা, সেখানে এনেছেন অসুস্থতার ভার।

এই অভিনয়ের মূল্য আরও বৃদ্ধি পায়, যখন ছবির অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে সব্যসাচীর সম্পর্কটি বিবেচনা করা যায়। সুমিত্রার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত আবেগের নয়; বিপ্লবী আদর্শেরও। অপূর্ব ও ভারতীর মতো চরিত্রদের সামনে তিনি একদিকে পথপ্রদর্শক, অন্যদিকে রহস্যময় উপস্থিতি। আর নিমাই রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন দুই বুদ্ধির সংঘর্ষ—একদিকে রাষ্ট্রের অনুসন্ধানী চোখ, অন্যদিকে আত্মগোপনের অসাধারণ কৌশল। এই দ্বন্দ্বের ভিতরেই গিরিশের ছদ্মবেশের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়।
আরও পড়ুন: যুদ্ধের অন্ধকারে লিঙ্কন: একটি জাতির আত্মার সন্ধানে
সব্যসাচী ও গিরিশের এই দ্বৈততার মধ্যেই উত্তমকুমারের অভিনয়-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে। সব্যসাচী হলেন প্রকাশিত শক্তি, গিরিশ সেই শক্তির গোপন রূপ। একজনকে দেখে শত্রু সতর্ক হবে, অন্যজনকে দেখে শত্রু হাসবে। কিন্তু বিপ্লবী সংগ্রামে প্রকাশ্য বীরত্বের পাশাপাশি অদৃশ্য থাকার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমকুমার সেই অদৃশ্য বীরত্বকে কোনও বক্তৃতা বা নাটকীয় ভঙ্গিতে নয়, শরীরী সংযম, আচরণ এবং দৃষ্টির সূক্ষ্মতায় প্রকাশ করেছেন।
এই কারণেই সব্যসাচী ছবির গুরুত্ব শুধু শরৎচন্দ্রের একটি জনপ্রিয় উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ হিসেবে নয়। এটি উত্তমকুমারের তারকা-ইমেজের বিরুদ্ধেও এক অভিনয়-পরীক্ষা। পীযূষ বোসের পরিচালনায় নির্মিত এই সাদা-কালো চলচ্চিত্রে মহানায়ককে এমন এক চরিত্রে দেখা যায়, যেখানে তাঁর পরিচিত নায়কোচিত আভা গল্পের ভিতরেই লুকিয়ে রাখতে হয়। তাঁর পাশে সুপ্রিয়া দেবী, বিকাশ রায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, তরুণ কুমার, কিরণ লাহিড়ী প্রমুখের অভিনয় ছবিটির চরিত্রজগতকে পূর্ণতা দেয়।
শেষ পর্যন্ত গিরিশ মহাপাত্রের মধ্যে দুটি মুখ পাশাপাশি থাকে—বাইরে এক অদ্ভুত, রুগ্ণ, হাস্যকর মানুষ; ভিতরে এক মেধাবী, সংযত বিপ্লবী সব্যসাচী। আর এই দুইয়ের মাঝখানে উত্তমকুমারের অভিনয়। তিনি চরিত্রটিকে নায়কোচিত করে তোলেননি, নায়কত্বকে লুকিয়ে রেখেছেন। অযাচিতভাবে এখানে তিনি অতিরঞ্জিত বীরত্ব দেখাননি, বীরত্ব অনুভব করিয়েছেন। স্বাভাবিকতার ভিতর রহস্য তৈরি করেছেন।
গিরিশ মহাপাত্র চরিত্রে তাই তারকা উত্তম দ্রবীভূত হয়ে, অভিনেতা উত্তম (Uttar Kumar) সামনে আসে। পরিচিত মুখ অপরিচিত হয়ে ওঠে। সব্যসাচী যেমন স্বাধীনতার জন্য নিজের পরিচয় আড়াল করেন, উত্তমকুমারও চরিত্রের জন্য নিজের তারকা-পরিচয় আড়াল করেছেন।
দেখুন: শতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার, স্মৃতির আবেশে মাতল টালিগঞ্জ




