• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 31 August, 2026

তামিলনাড়ুর উন্নয়নের অন্যতম বড় শক্তি ছিল রাজনীতির ধারাবাহিকতা

রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার লড়াই মূলত দুই দ্রাবিড় দল— ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের মধ্যে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলেও শিল্পায়ন, পরিকাঠামো এবং সামাজিক ন্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য বহু বছর ধরে বজায় ছিল

তামিলনাড়ুর উন্নয়নের অন্যতম বড় শক্তি ছিল রাজনীতির ধারাবাহিকতা

Image: IANS

তামিলনাড়ুর উন্নয়নের অন্যতম বড় শক্তি ছিল রাজনীতির ধারাবাহিকতা। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার লড়াই মূলত দুই দ্রাবিড় দল— ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের মধ্যে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলেও শিল্পায়ন, পরিকাঠামো এবং সামাজিক ন্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য বহু বছর ধরে বজায় ছিল। ফলে সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের জন্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলি খুব বেশি বাধার মুখে পড়েনি। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার তুলনায় তামিলনাড়ুকে অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে করেছেন।

এই ধারাবাহিকতার পিছনে রাজ্যের দক্ষ আমলাতন্ত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ভারতের বহু রাজ্যে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে আগের সরকারের প্রকল্প বাতিল বা পরিবর্তনের ঘটনা দেখা যায়। তামিলনাড়ু তুলনামূলক ভাবে সেই প্রবণতা থেকে দূরে ছিল।অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে করুণানিধির আমলে তৈরি প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার বিধানসভা ও সচিবালয় ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধ কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, সেটি ছিল তার একটি বড় উদাহরণ। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে এই ধরনের ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।

এখন সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে।চেন্নাইয়ের দ্বিতীয় বিমানবন্দর তৈরির জন্য পরন্দুরকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের সরকার চেন্নাই থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এই প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নতুন মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয় সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এর ফলে ১২টি গ্রামের বহু কৃষককে তাঁদের জমি হারাতে হবে। জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদও দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

কৃষকের জমি রক্ষা এবং মানুষের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। উন্নয়নের নামে মানুষের জীবন-জীবিকা উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, একটি বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাতিল করার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ফল কী হতে পারে।

চেন্নাই ইতিমধ্যেই বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের মতো শহরের সঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে। তার বর্তমান বিমানবন্দরও নানা সমস্যায় জর্জরিত এবং পরিষেবার মানে দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি প্রধান বিমানবন্দরের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের জন্য একটি দ্বিতীয় বিমানবন্দর চেন্নাইয়ের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়াতে পারত। সেই প্রকল্প বাতিল হলে শহরের বিনিয়োগ সম্ভাবনার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন সরকারের অবস্থানের পিছনে অবশ্য রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে। বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজগম (টিভিকে) নির্বাচনের আগে পরন্দুর বিমানবন্দর প্রকল্প বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করা রাজনৈতিক ভাবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু জনতুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের আসল পরীক্ষা।কৃষিজমি যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করার প্রতিশ্রুতিও শুনতে ভালো। কিন্তু বাস্তবে বড় শিল্প বা পরিকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই নীতি কার্যকর করা সহজ নয়।

অন্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উন্নয়ন ও জমি রক্ষার মধ্যে সমন্বয় করতে হলে বিকল্প পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা দরকার।বিজয়ের ক্ষমতায় আসা তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন দেখার বিষয়, তাঁর সরকার কি আগের প্রশাসনগুলির উন্নয়নের মডেলকে সম্পূর্ণ বদলে নতুন পথ তৈরি করবে, নাকি পুরনো ধারাবাহিকতার মধ্যেই পরিবর্তন আনবে। দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনীতি বদলাতে পারে, সরকারও বদলাতে পারে। কিন্তু উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেন রাজনৈতিক পালাবদলের শিকার না হয়—তামিলনাড়ুর সামনে এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।