নাট্যমঞ্চ থেকে সিনেমার পর্দায় ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’। ২০০২ সালে ব্রাত্য বসুর লেখা ও মঞ্চস্থ এই নাটক।সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলাদা করে নজর কেড়েছিল। প্রায় ২৪ বছর পর সেই নাটকই এবার পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে আসছে বড় পর্দায়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সেন্সর জটিলতা— সব কিছু নিয়েই পরিচালকের সঙ্গে কথা বললেন দেবযানী লাহা ঘোষ।
বহু বছর আগে মঞ্চে ব্রাত্য বসুর ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ আমরা দেখেছি। সেই নাটককেই সিনেমায় নিয়ে আসার ভাবনা কীভাবে এল?
সৃজিত: ২০০২ সালেই যখন নাটকটি দেখেছিলাম, সেটি আমার মনে দাগ কেটেছিল। ছোটবেলা থেকে আমি যে সব সাহিত্য পড়েছি, তার মধ্যে ‘জুলিয়াস সিজার’, ‘চৌরঙ্গী’— এই ধরনের গল্প আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। সেই সব গল্প থেকেই অনেক সময় সিনেমা বানানোর অনুপ্রেরণা পেয়েছি। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর ক্ষেত্রেও বলা যায়, সেই সময়ের ভাল লাগা থেকেই এই ভাবনার শুরু।
নাটক থেকে সিনেমা— মূল গল্পের সঙ্গে কতটা মিল আছে? নাকি নিজের মতো করে অনেকটাই বদলেছে?
সৃজিত: আমার মনে হয়, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ মূলত সত্যি এবং ক্ষমতার কথা বলে। ছবিতে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রেক্ষাপট থাকলেও দর্শক গল্পের আসল জায়গাটা বুঝতে পারবেন। কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলা হচ্ছে, সেটাও দর্শকের কাছে পরিষ্কার হবে। তবে ছবিটাকে সিনেমার উপযোগী করে আমরা নিজেদের মতো করে সাজিয়েছি।
ছবিটি প্রায় দেড় বছর আগে শুট করা হয়েছিল। তার পরেও মুক্তি আটকে গেল। কী হয়েছিল?
সৃজিত: রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ছবিটি সেন্সরে আটকে ছিল। আমাদের বোঝাতে হয়েছিল, ছবির প্রেক্ষাপটের প্রয়োজনে ওই নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, ন্যাশনাল ইমারজেন্সি নিয়ে ছবি তৈরি করলে ইন্দিরা গান্ধীর নাম না নিয়ে সেই সময়ের কথা বলা কঠিন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তাঁরা বুঝেছেন এবং ছবিটি ছাড়পত্র পেয়েছে।
ছবিটি আসলে জানুয়ারি মাসেই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তখন রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হবে, সেটা আমরা কেউই জানতাম না। তাই কোনও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে বা ছবির প্রচারের জন্য এই ছবি তৈরি করা হয়নি। ছবিটি নিজের মতো করেই তৈরি হয়েছে। সেন্সরের জটিলতা মিটে যাওয়ার পর এবার
মুক্তি পাচ্ছে।
ব্রাত্য বসুর নাটক থেকে গল্প নিয়ে চিত্রনাট্যও কি তোমার লেখা?
সৃজিত: হ্যাঁ। চিত্রনাট্য লিখেছি আমি এবং পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।
তুমি নিজে জেএনইউ-এর ছাত্র ছিলে। জেএনইউ ছাত্রদের দিকে সারা ভারত তাকিয়ে থাকে। কারণ তোমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ খুবই আলাদা। এই ছবি নিয়ে কতটা সমালোচনা হবে বলে তোমার মনে হয়?
সৃজিত: সমালোচনা তো হতেই পারে। ভাল কোনও কাজ হলে প্রশ্ন উঠবে, সমালোচনা হবে— এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি কোনও ছবিকে নিয়েই আলোচনা হতে পারে। আমরা যেমন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক দেখি, এই ছবিতেও কোনও একটি পক্ষের হয়ে কথা বলা হয়নি। আমার আগের ছবিগুলিতেও আমি পক্ষপাতিত্বের জায়গা থেকে ছবি করিনি। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ মন দিয়ে দেখলে দর্শক রাজনৈতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান খুঁজে পাবেন।
একটা সময় ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। সেই সময়ও ছিল রাজনৈতিক পালাবদলের পর্ব। আর এত বছর পর সিনেমাটি যখন মুক্তি পাচ্ছে, তখনও রাজ্যে আবার পালাবদল হয়েছে। এই সমাপতনকে কীভাবে দেখছো?
সৃজিত: (খুব হেসে) এটা পুরোপুরি কাকতালীয়। এর পিছনে আমার বা আমাদের কোনও হাত নেই। আগেই বলেছি, ছবিটি জানুয়ারি মাসে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তখন রাজনৈতিক পালাবদলের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এইভাবে ছবির মুক্তি হওয়াটা নিঃসন্দেহে খুবই ইন্টারেস্টিং একটা সমাপতন।
তোমার ছবিতে মিউজিকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর গান নিয়ে কী বলবে?
সৃজিত: এই ছবিতে নতুন একজন সুরকার, তমালিকা গোলদার, আত্মপ্রকাশ করছেন। এ ছাড়াও দু’বছর আগে রাপূর্ণা একটি গান গেয়েছিলেন। আমাদের মিউজিক ডিরেক্টরও খুব ভাল কাজ করেছেন। প্রবুদ্ধদার আবহসঙ্গীত। সব মিলিয়ে ছবির মিউজিক অ্যালবামটা বেশ স্ট্রং।
ছবির কাস্টিং নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ রয়েছে। তার উপর ট্রেলারও ইতিমধ্যে নজর কেড়েছে। কাস্টিং নিয়ে কী বলবে?
সৃজিত: ছবির কাস্টিংটা খুবই ইন্টারেস্টিং। গল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সেটা এতটা মিলে যাবে, সেটা আমি নিজেও ভাবিনি। আগেও বলেছি, এর পিছনে কোনও পরিকল্পনা ছিল না। অনেকটাই কাকতালীয় ভাবে হয়েছে। হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল। অনসূয়াদি, পরমব্রত, ঋত্বিক এবং সোহিনী—প্রত্যেকেই খুব ভালো অভিনয় করেছেন।
বাংলায় রাজনৈতিক ছবি খুব বেশি তৈরি হয় না। বলিউডে অবশ্য রাজনৈতিক ছবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’কে ঘিরে বাংলা রাজনৈতিক ছবির ক্ষেত্রে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হবে বলে মনে হয়?
সৃজিত: অবশ্যই। একটা কথা বাংলার দর্শকদের বলতে চাই— এই ছবিটা আমার অন্যান্য ছবির মতো নয়। এটা কোনও পারিবারিক ড্রামা, গোয়েন্দা গল্প বা অন্য কোনও প্রেক্ষাপটের ছবি নয়। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি। ফলে দর্শক এখানে অন্য রকম একটা স্বাদ পাবেন বলেই আমার আশা।
দর্শকদের উদ্দেশে ছবিটি নিয়ে কী বলবে?
সৃজিত: আগামী ৪ সেপ্টেম্বর ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ মুক্তি পাচ্ছে। দর্শকদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আপনারা হলে গিয়ে ছবিটি দেখুন।
যেভাবে মানুষ নাটকটিকে ভালোবাসা দিয়েছিলেন, আশা করব সিনেমাটিকেও সেই ভালোবাসা দেবেন। আপনারা ছবিটি দেখুন, ভালো লাগলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।




