• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 27 August, 2026

বর্ষার ঘাটতি ও খাদ্য-মূল্যস্ফীতির জোড়া ফলা

কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চ আর্থিক বৃদ্ধিকে তার অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেছে। এ বার পরীক্ষা, সেই বৃদ্ধি অর্থনীতির ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা কতখানি বাড়িয়েছে। ধাক্কা বহিরাগত হতে পারে, তার অভিঘাত কতখানি অসহনীয় হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নের উত্তর বহুলাংশ অর্থনৈতিক পরিচালনার উপরে নির্ভরশীল।

বর্ষার ঘাটতি ও খাদ্য-মূল্যস্ফীতির জোড়া ফলা

Photo: বর্ষার ঘাটতি ও খাদ্য-মূল্যস্ফীতির জোড়া ফলা (AI)

বর্ষার ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়েছিল এই বছরের জুন। জুলাই মাসে ভারতে বর্ষার সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিপদ কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে জানা গিয়েছে, আগস্ট থেকে এক প্রবলতর এল নিনোর প্রভাব ঠেলে তুলবে তাপমাত্রাকে, পাল্টে দেবে মরসুমি বৃষ্টির ধরন। এবং সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির অন্যতম হবে ভারত। এই দুঃসংবাদ শুনিয়েছে বিশ্বের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা ডব্লিউএমও। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে তাপমাত্রা। ইঙ্গিত মিলেছে কম বৃষ্টিপাতেরও। নিঃসন্দেহে বর্ষার বৃষ্টিপাতের উপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রবল নির্ভরশীল দেশের পক্ষে এই তথ্য ঘোর দুঃসংবাদ।

এল নিনো এক বিশেষ প্রাকৃতিক অবস্থা। তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চাবিকাঠি এখনও বিজ্ঞান অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, তাকেও কি ক্ষমতাসীনরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন? উপরোক্ত রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেসের উক্তিটি তাই অগ্রাহ্য করা চলে না। এই অসহনীয় পরিস্থিতির জন্য তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার-বৃদ্ধিকেও সমান ভাবে দায়ী করেছেন।
কেন এত ঘন ঘন শক্তিশালী এল নিনোর আগমন— এ নিয়ে নানাবিধ আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এর জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করলেও সরাসরি উভয়ের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি এখনও প্রমাণিত নয়। তবে অনস্বীকার্য যে, উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় ইতিমধ্যেই প্রায় দেড় ডিগ্রি স্পর্শ করেছে।

ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলি গ্রীষ্মকালে অস্বাভাবিক গরমে পুড়ছে, মৃত্যু হচ্ছে অসংখ্য মানুষের। উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিয়মিত হানা দিচ্ছে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, অসময়ের বন্যায় ধুয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল— এ সবই চরম আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ের লক্ষণ, যার পিছনে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর এখনও অত্যধিক নির্ভরতার কারণটি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সেই অসহনীয়তাকেই এই বছর আরও অনেকটা বাড়িয়ে তুলবে, অবধারিত ভাবে। এল নিনো স্প্যানিশ শব্দ। অর্থ, ‘ছোট্ট ছেলে’। পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী যে বায়ু সাধারণত উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, সেই বায়ু হঠাৎ করে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে উষ্ণ জল আবার পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে বইতে থাকে। ওই স্রোতের প্রভাবে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। বইতে শুরু করে উষ্ণ স্রোত। একেই বলা হয় এল নিনো।

কয়েকশো বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যজীবীরা প্রশান্ত মহাসাগরে এই অস্বাভাবিক স্রোত লক্ষ করেছিলেন। স্রোতের নামকরণ করেছিলেন তাঁরাই। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অগস্ট থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ তীব্র রূপ ধারণ করতে চলেছে। এর প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, তীব্র দাবদাহ ও অস্বাভাবিক বৃষ্টির আশঙ্কা থাকছে।

দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণে আবার তারতম্য দেখা যায়। ভারতেও এর প্রভাব পড়বে। তবে সেটা বোঝা যাবে চলতি বছর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাব শেষ হওয়ার পর। অবশ্য ভারত মহাসাগর এবং ভারতের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে এল নিনোর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ দেরিতেই দেখা যায়। ভারতের মৌসম ভবন (আইএমডি) বলছে, চলতি বর্ষা পর্যন্ত
এল নিনোর প্রভাব পড়েনি। তবে তাদের রিপোর্টও বলছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে এমন একটি ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ ঘটার ৬৯ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। যার তীব্রতা ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া পূর্ববর্তী এল নিনোগুলোর তীব্রতাকে ছাপিয়ে যাবে।

এই বর্ষায় ইতিমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে ভারতে। গত ১ জুন থেকে ১৩ অগস্টের মধ্যে ৪৯১.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ শতাংশ কম। জুন মাসে ৩৫.৪ শতাংশ বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল। জুলাইয়ের বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের কাছাকাছি ছিল। কয়েক দশক পরে এল নিনোর চরম প্রভাব পড়তে চলেছে বিশ্বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দাবি, ১৯৫০ সালের পর এল নিনোর এমন প্রভাব পড়েনি। আর সেটারও খুব দেরি নেই। চলতি বছরের শেষ দিকেই এল নিনোর প্রভাব তীব্র হবে। উত্তর গোলার্ধে শীতকালে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছোবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। মধ্য এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়েছে, যা এল নিনো বলে ধরে নেওয়া হয়। পূর্বাভাস বলছে, জুন থেকে অগস্টে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। তার প্রভাবে ভারতে দুর্বল হতে পারে বর্ষা। তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পেতে পারে। কোথাও কোথাও খরাও দেখা দিতে পারে।

খরিফ চাষের উপরে এল নিনোর প্রভাব নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নজরদারির তালিকায় চলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গও। এল নিনোর প্রভাবে দেরিতে বর্ষা আসার ফলে দেশের যে ১২টি রাজ্যে খরিফ চাষ মার খেতে পারে বলে কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের আশঙ্কা ছিল সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ ছিল না। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গের উপরেও এখন সতর্ক নজরদারি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই তালিকায় মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, কর্ণাটক, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পাঞ্জাব, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা রয়েছে। কৃষি মন্ত্রকের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এখন দেশের ১৭৮টি জেলায় বর্ষার ঘাটতি রয়েছে। তবে জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। চিন্তার কথা হল, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এ বার প্রায় ৯২ লক্ষ হেক্টর কম জমিতে খরিফের বীজ বপন হয়েছে। বিশেষ করে সয়াবিন ও তুলোর চাষ ধাক্কা খেয়েছে। সরকারের চিন্তা হল, কৃষিতে উৎপাদন ধাক্কা খেলে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের পরে সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতিতে দ্বিতীয় ধাক্কা লাগবে। ঠিক এই কারণে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নিজে বৈঠকে বসেছেন। তাঁর বক্তব্য, বীজের ভান্ডার, ফসল বিমার সুবিধে চাষিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

জুনে দেশে বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম হয়েছে— ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সর্বনিম্ন। জুনের শেষ থেকে বৃষ্টি বাড়ায় ঘাটতি কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু খরিফ চাষ এখনও পিছিয়ে, বিশেষত ডাল, তৈলবীজ ও তুলোয়। জুলাইয়েও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে বিপদ শুধু খরিফ ফসলে আটকে থাকবে না। বৃষ্টির ঘাটতি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শীত যদি অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং সংক্ষিপ্ত হয়, তবে গম, সর্ষে, ছোলা, মসুর, আলুর মতো রবি ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, এক দিকে যুদ্ধ উৎপাদনের খরচ বাড়াচ্ছে, অন্য দিকে প্রতিকূল আবহাওয়া খাদ্যপণ্যের জোগান কমাতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও বেশি। ভোজ্য তেল এবং ডালের চাহিদা মেটাতে দেশকে বিপুল পরিমাণ আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ঘাটতি হলে আরও আমদানি অনিবার্য; কিন্তু অস্থির আন্তর্জাতিক বাজার এবং টাকার বিনিময় হারের উপরে চাপ সেই পথটিকেও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।

২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে উচ্চ হারে খাদ্য-মূল্যস্ফীতির ঘটেছিল। ফলে, যুদ্ধ অথবা এল নিনো— কোনটি বড় বিপদ, সেই তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়েও বলা চলে, একটি যে পথে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে, অন্যটি সেই পথকেই আরও প্রশস্ত করতে পারে। জ্বালানি থেকে খাদ্য— মূল্যবৃদ্ধির পরিধি বিস্তৃত হলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের কাজও কঠিন হবে। সুদের হার দিয়ে সরবরাহের সঙ্কট মেটানো যায় না; অথচ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায় তারই। এই দ্বন্দ্ব যত তীব্র হবে, আর্থিক বৃদ্ধির উপরে চাপও তত বাড়বে। যুদ্ধ থামানো ভারত সরকারের হাতে নেই, এল নিনো নিয়ন্ত্রণাতীত। কিন্তু, দুই বহিরাগত ধাক্কার অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতি সম্পূর্ণতই নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন।

ডাল ও ভোজ্য তেলের জোগান নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে আগাম আমদানির ব্যবস্থা রাখা, কৃষককে কার্যকর মূল্য-সুরক্ষা দেওয়া, জলসাশ্রয়ী ফসলে চাষের প্রণোদনা বাড়ানো এবং ফসল বিমা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পকে বাস্তবে কার্যকর রাখার কাজ এখনই করতে হবে। দীর্ঘ দিন ধরে ডাল ও ভোজ্য তেলে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে না-পারা কৃষি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা; অনুকূল আবহাওয়ায় তাকে আড়াল করা যায়, সঙ্কটের সময়ে নয়। কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চ আর্থিক বৃদ্ধিকে তার অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেছে। এ বার পরীক্ষা, সেই বৃদ্ধি অর্থনীতির ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা কতখানি বাড়িয়েছে। ধাক্কা বহিরাগত হতে পারে, তার অভিঘাত কতখানি অসহনীয় হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নের উত্তর বহুলাংশ অর্থনৈতিক পরিচালনার উপরে নির্ভরশীল।