‘যে তোরে পাগল বলে
তারে তুই বলিস নে কিছু
আজকে তোরে কেমন ভেবে অঙ্গে যে তোর ধুলো দেবে
কাল সে প্রাতে মালা হাতে আসবে রে তোর পিছু-পিছু।’
রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Thakur) ‘রক্তকরবী'(Raktokarabi)-র বিশু পাগলকে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, সে বুঝি যক্ষপুরীর নিয়মকানুনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষ। তার কথায় যুক্তির চেয়ে গান বেশি, হিসেবের চেয়ে অনুভব অনেক তীব্র। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই প্রশ্ন জাগে—বিশু কি আসলে পাগল? নাকি যক্ষপুরীর স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া পাগলামির বিরুদ্ধে একমাত্র স্বাভাবিক মানুষ?
যে পৃথিবীতে মানুষ নাম হারিয়ে নম্বর হয়ে যায়, সেখানে যে মানুষ বলে ওঠে—মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে হবে—তাকেই তো ক্ষমতা পাগল বলে দাগিয়ে দেয়। যক্ষপুরীর খনির শ্রমিকদের দিকে তাকালেই সেই অমানবিকতার চেহারাটা স্পষ্ট হয়। তারা কেউ ১৬৯ ঙ, কেউ ৪৫ খ, কেউ বা অন্য কোনও সংখ্যা। নাম নেই, মুখ নেই, ব্যক্তিগত স্বপ্ন নেই—আছে শুধু উৎপাদনের হিসেব। পুঁজির কাছে শ্রমিক তখন আর পূর্ণ মানুষ নয়, উৎপাদনের একটি ইউনিট। আশ্চর্য লাগে, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, ব্যবস্থার ভাষা বদলেছে, কিন্তু নম্বরের রাজত্ব আজও শেষ হয়নি। তাই আজও লেখা হয়—
‘অবিকল যক্ষপুরী,
কেন হে প্রশ্ন করো?
আধারের সংখ্যা হয়ে
আঁধারে গুমরে মরো!’
আধার নম্বর থেকে কর্মীর Employee Code—প্রশাসনিক প্রয়োজনে নম্বর দরকার হতে পারে। বিপদ শুরু হয় তখন, যখন নম্বর মানুষের পরিচয়কে গ্রাস করে ফেলে। মানুষ তখন তার নামের চেয়ে তার কোডে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। হীরক রাজার দেশের খনির শ্রমিকদের মধ্যেও আমরা সেই একই ছবির ছায়া দেখতে পাই। মানুষ কাজ করে, উৎপাদন করে, অথচ নিজের জীবনের উপর তার অধিকার থাকে না। ‘রক্তকরবী’-র যক্ষপুরী আর ‘হীরক রাজার দেশে’-র খনি যেন একই অন্ধকারের দুই আলোকচিত্র। দু’জায়গাতেই ক্ষমতা মানুষের প্রাণের চেয়ে উৎপাদনকে বড় করে দেখে। শ্রমিক সেখানে শুধুই সংখ্যা।
আরও পড়ুন: নেতাজির পাশে বিউগল বাজাতে দেখা যায়- এই ব্যক্তিকে চেনেন, এঁর উত্তরাধিকারী কোথায় জানেন?
এই কারণেই বিশু পাগলের (Rabindranath Thakur) গান এত গুরুত্বপূর্ণ। সে শুধু গান গায় না, যক্ষপুরীর সংখ্যার ভিড়ে মানুষের অস্তিত্বকে আবার উচ্চারণ করে। আর নন্দিনী সেই কাজটিকেই অন্যভাবে সম্পূর্ণ করে। সে মানুষকে তার পরিচয় ফিরিয়ে দেয়। যক্ষপুরীর (Raktokarabi) কাছে যে শ্রমিক একটি নম্বর, নন্দিনীর কাছে সে একজন মানুষ—তার অনুভূতি আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, ভালোবাসা আছে, স্বাধীনতার অধিকার আছে।
বিশুর গান আর নন্দিনীর (Raktokarabi) উপস্থিতি তাই একই বিদ্রোহের দুই ভাষা—একটি গান দিয়ে, অন্যটি ভালোবাসা দিয়ে। এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথের ‘তোতা-কাহিনী’-র নিন্দুকের কথা মনে পড়ে। রাজা, পণ্ডিত, বই, খাঁচা আর নিয়মের জাঁকজমক দেখে সে মুগ্ধ হয় না। সে বুঝতে পারে, শিক্ষার নামে যদি প্রাণটাকেই বন্দি করে ফেলা হয়, তবে সেই শিক্ষা আর শিক্ষা থাকে না। তাই সে প্রশ্ন করে। আর প্রশ্ন করাটাই যখন অপরাধ, তখন নিন্দুকও হয়ে ওঠে এক ‘পাগল’।
আজকের দিনে হলে হয়তো তাকে বলা হতো—বেয়াদব, অবাস্তববাদী। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Thakur) মুক্তধারা-তেও বাঁধ কেবল জলস্রোত আটকে রাখে না, আটকে রাখে মানুষের জীবনতরঙ্গ। প্রকৃতি, শ্রম এবং মানুষকে যখন ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়, তখন বাঁধ হয়ে ওঠে শাসনের প্রতীক। তাই বাঁধ ভাঙার আহ্বান কেবল জলস্রোতের মুক্তির কথা নয়; সমস্ত কৃত্রিম বন্দিত্বের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন ডাক। ‘তাসের দেশ’-এও সেই একই বিদ্রোহ। সেখানে মানুষ নিয়মের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকের আচরণ নির্ধারিত, জীবন নির্ধারিত, সম্পর্ক নির্ধারিত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—নিয়ম কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ নিয়মের জন্য?
মানুষ যখন এই প্রশ্নটি করতে শেখে, তখনই ‘তাসের দেশ’ (Rabindranath Thakur) ভাঙতে শুরু করে।আর ডাকঘর-এর অমল? সে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেও বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার কল্পনার জানালা খোলা। বন্দিত্ব তার শরীরকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু তার পৃথিবীকে আটকে রাখতে পারে না। অমলও তাই অন্য এক অর্থে সেই একই ‘পাগল’—যে বন্ধ দরজার ওপারে অসীম পৃথিবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে।
এই জন্যই রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Thakur) পাগলরা (Raktokarabi)আসলে পাগল নন। তারা সেই মানুষ, যারা প্রতিষ্ঠিত স্বাভাবিকতার ভিতরের অস্বাভাবিকতাকে দেখতে পায়। তারা জানে—সবাই যা মেনে নিচ্ছে, সেটাই সত্য নয়।
কবি জয়দীপ রাউতের কাছে শোনা, বিনয় মজুমদার একবার তাঁকে বলেছিলেন—’দেখো, এখানে আটজন মানুষ আছি। সমাজের চোখে সাতজন তোমরা সুস্থ আর আমি একজন পাগল। এবার যদি উল্টোটা হয়? যদি সেই একজনই মানে আমি একমাত্র সুস্থ, আর তোমরা বাকি সাতজনই পাগল? কখনও ভেবে দেখো।’এই প্রশ্নটাই আসলে বিশু পাগলের প্রশ্ন।আর সেই পাগলামি শুধু সাহিত্যের পাতায় আটকে থাকে না। বাস্তবের পৃথিবীতেও বিশু পাগলেরা ফিরে ফিরে আসে।
ক্ষুদিরাম যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে হাঁটলেন, তখন প্রচলিত নিরাপদ জীবনের হিসেব দিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তকে বোঝা কঠিন। সুভাষচন্দ্র বসু যখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নকে অসম্ভবের সীমা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, তখনও সেই স্বপ্ন ছিল প্রচলিত বাস্তবতার চোখে এক ধরনের পাগলামি।
আরও পড়ুন: বঙ্গের মনসা দেবী এবং গ্রিক দেবী মেডুসা কি একই? এই দুই দেবীর সংগ্রামের বিষয়ে জানেন?
আর আর্নেস্তো চে গ্যেভারা? এক দেশে জন্ম নিয়ে অন্য দেশের মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে নিজেকে জড়িয়ে দেওয়া, স্বচ্ছন্দ জীবন ও ক্ষমতার অবস্থান ছেড়ে বিপ্লবের পথে হাঁটা—প্রচলিত স্বার্থের অঙ্কে সেটিও তো এক ধরনের পাগলামি। হিটলারকে ব্যঙ্গ করে চার্লি চ্যাপলিন ‘The Great Dictator’-এ যে সাহস দেখিয়েছিলেন, সেখানেও ছিল সেই পাগলামির দুঃসাহস। ফুটবল মাঠে ফিফার ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে দিয়েগো মারাদোনার একগুঁয়ে প্রতিবাদী অবস্থান হোক, কিংবা ঋতুপর্ণ ঘোষের ব্যক্তিসত্তার প্রচলিত ছক ভেঙে নিজের ভাষা তৈরি করা—সব ক্ষেত্রেই একই প্রশ্ন ফিরে আসে: কে ঠিক করে দেবে স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা?

একটি পাগলামি থেকে আরেকটি পাগলামি জন্ম নেয়। একটি মশালের আগুন থেকে আরেকটি মশাল জ্বলে ওঠে। ‘হীরক রাজার দেশে’-র উদয়ন পণ্ডিতের হাতে যে মশাল জ্বলে ওঠে, সেই আগুনের উৎস খুঁজলে আমরা পৌঁছে যাই ক্ষুদিরাম, সুভাষচন্দ্র, চে গ্যেভারাদের বিদ্রোহের কাছে। সেই বিদ্রোহী আগুনের আলো পৌঁছে যায় তাদের কাছেও, যারা শাসক এবং সমাজের প্রতিষ্ঠিত সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—না, এভাবে নয়।তাই বিশু পাগলেরা মরে না।
যক্ষপুরী বদলে যায়। রাজা বদলে যায়। শাসনের ভাষা বদলে যায়। খাঁচার চেহারা বদলে যায়। মানুষের পরিচয় বদলে দেওয়ার পদ্ধতিও বদলে যায়। কিন্তু খাঁচা ভাঙার মানুষটি আবার ফিরে আসে।কখনও সে কবি। কখনও ছাত্র। কখনও বিপ্লবী। কখনও ফুটবলার। কখনও চলচ্চিত্রকার। কখনও রাস্তার মিছিলে হাঁটা এক অচেনা তরুণী। যে গলার শিরা কাঁপিয়ে স্লোগান তোলে।
আজকের Gen Z-র মধ্যেও সেই স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়—পুরনো নিয়মকে প্রশ্ন করার পাগলামি, অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে না নেওয়ার পাগলামি, নিজের ভবিষ্যৎ নিজের মতো করে চাওয়ার পাগলামি। ক্ষমতা প্রতিটি যুগেই তাদের অন্য নামে ডাকবে—বেয়াদব, অবাস্তববাদী, উচ্ছৃঙ্খল, দেশদ্রোহী, পাগল। কারণ ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় শুরু হয় সেই মানুষগুলোর হাতেই, যাদের সমকাল ‘পাগল’ বলে চিনেছিল।বিশু পাগলেরা তাই ফিরে ফিরে আসে।
তারা আসে বাঁধ ভাঙতে।
খাঁচার দরজা খুলতে।
নিয়মের শিকল ছিঁড়তে।
নম্বরের আড়াল থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে আনতে।
এক মশাল থেকে আরেক মশালে আগুন পৌঁছে দিতে।
রাত জাগা পাঁচিলের দেওয়ালে তাই কাস্তের মতো ভাঙা চাঁদের গ্রাফিতি আঁকা হয়।
লেখা হয়—
মশাল চুম্বন করে জ্বলে ওঠে সহস্র মশাল।
যক্ষপুরীতে দেখো, আজও কিছু পাগলেরা
সূর্যের সন্ধান করে।
পূবাকাশ লাল।
দেখুন:




