বুধবারের রক্তক্ষয়ী হড়পা বানের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের সতর্কবার্তা এল বেজিং থেকে। চিন জানিয়ে দিল, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া একটি নতুন প্রাকৃতিক বাঁধ-হ্রদ বা ব্যারিয়ার লেক (barrier lake) যে কোনও মুহূর্তে ফেটে যেতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এই বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেজিং। আর তার জেরে ফের একবার কাঁপতে পারে নেপাল, বিহার এবং পরোক্ষে উত্তরবঙ্গও।
কোথায়, কী ভাবে তৈরি এই হ্রদ
চোচেন খোলা (Chhochen Khola) এবং পুরেপু সাংপো (Purepu Tsangpo), তিব্বত থেকে বয়ে আসা এই দুই নদীর মিলনস্থলেই জন্ম নিয়েছে বিপজ্জনক এই হ্রদটি। চিনের জলসম্পদ মন্ত্রকের (China’s Ministry of Water Resources) হিসেব বলছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হ্রদে জমেছিল প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল। উদ্বেগের বিষয় হল, হ্রদ ইতিমধ্যেই উপচে পড়তে শুরু করেছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল এসে জমা হতে পারে বলে পূর্বাভাস চিন সেন্ট্রাল টেলিভিশনের (CCTV) সূত্রে। অর্থাৎ, বাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
চোচেন এবং পুরুপে নদী দুটি তিব্বতে উৎপন্ন হয়ে নেপালে প্রবেশ করে ভোটেকোশী (Bhotekoshi) নামে পরিচিত হয়, যা আবার ত্রিশূলী (Trishuli) নদীর প্রধান শাখা। ফলে হ্রদ ফাটলে তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে নেপালের ওই জনপদগুলিতেই, যেখানে বুধবারের বিপর্যয়েই লন্ডভন্ড অবস্থা।
বিপর্যয়ে ক্ষতবিক্ষত
বুধবার সকালে আচমকা হড়পা বানে ভেসে যায় নেপালের রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসি এলাকা। রাস্তাঘাট, সেতু, বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে জল নেমে আসে ত্রিশূলী নদী ধরে নুওয়াকোটের দিকে। বেত্রাবতী, ত্রিশূলী বাজার, ধুঙ্গে, দেবীঘাটের মতো জনবহুল এলাকাও প্লাবিত হয়। এখনও পর্যন্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়েছে, চিনের দিকেও প্রাণ গিয়েছে বেশ কয়েকজনের। নিখোঁজের তালিকায় নাম রয়েছে বহু ভারতীয়-সহ অগুনতি বিদেশি পর্যটকেরও।
কী কারণে এই বিপর্যয়, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের প্রাথমিক অনুমান, তিব্বতে হওয়া একটি মৃদু ভূকম্পনের (মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা বা USGS-এর হিসেবে মাত্রা ৪.৪) জেরে তুষারধস নামে লেন্দে খোলা (Lhende Khola) নদীতে, আর তা থেকেই এই ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস। যদিও সমাজমাধ্যমের একাংশে দাবি উঠেছে, তিব্বতে চিনের তৈরি কৃত্রিম বাঁধই এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে থাকতে পারে। বেজিং অবশ্য সেই অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।
হিমবাহী হ্রদের বিপদ
হিমালয় জুড়েই ক্রমশ বাড়ছে হিমবাহ গলনের জেরে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক হ্রদ ফেটে বন্যা, যাকে বলে হিমবাহী হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা গ্লোফ (Glacial Lake Outburst Flood, GLOF)। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের আগস্টেই তিব্বতের একটি সুপ্রাগ্লেসিয়াল হ্রদ (supraglacial lake) উপচে একই ধরনের বন্যা হয়েছিল এই এলাকায়, প্রাণ গিয়েছিল ৯ জনের। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিব্বতের অসংখ্য বিপজ্জনক হ্রদের কোনও একটি ফাটলেও তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে নেপাল হয়ে ভারতের সমতলে।
সমস্যা হল, চিন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে বন্যা সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানের পরিকাঠামো এখনও যথেষ্ট মজবুত নয়। ফলে উজানে বিপদ তৈরি হলেও ভাটির বাসিন্দাদের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছতে অনেক সময়ই দেরি হয়ে যায়। নেপাল সীমান্তের প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার জুড়ে থাকা কোশী, গণ্ডক, কর্ণালীর মতো নদীগুলির উৎসও তিব্বতেই, যে কারণে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
বিহার থেকে উত্তরবঙ্গেও প্রভাব
নেপালের এই নদীগুলি নিম্ন অববাহিকায় গিয়ে মেশে বিহারের কোশী ও গণ্ডক অববাহিকায়। অতীতে দেখা গিয়েছে, নেপালে ভারী বৃষ্টি বা বাঁধ ফাটার মতো ঘটনার জেরে বিহারের বীরপুর কোশী ব্যারাজ থেকে প্রবল জল ছাড়তে হয়েছে, যার আঁচ গিয়ে পড়েছে সুপৌল, সহরসা, মধেপুরার মতো জেলায়। বর্তমান হ্রদ-বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব মূলত ওই অববাহিকাতেই পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই নদীগুলির সরাসরি যোগ না থাকলেও, উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান একই রকম ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ির মতো পার্বত্য জেলাগুলি তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকার মতো নদীর উপর নির্ভরশীল, যেগুলির উৎসও হিমালয়েরই বরফ ও হিমবাহ। সিকিম-ভুটানের ভারী বৃষ্টিতেই সম্প্রতি তিস্তা ফুঁসে ওঠায় গজলডোবা ব্যারাজ থেকে জল ছাড়তে হয়েছিল, লাল-হলুদ সতর্কতাও জারি হয়েছিল উত্তরবঙ্গ জুড়ে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যে ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে, একই ধরনের গ্লোফ (GLOF) ঝুঁকি সিকিম-ভুটান সীমান্ত ঘেঁষা উত্তরবঙ্গের নদীগুলির উপরেও সমান ভাবে প্রযোজ্য।
উদ্ধারকাজ ও প্রস্তুতি
চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক জানিয়েছে, হ্রদের পরিস্থিতির উপর নিরন্তর নজরদারি চলছে। বাঁধ ফাটলে কী হতে পারে, তা নিয়ে বন্যা-সিমুলেশন চালানো হচ্ছে, যাতে বিপদ ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়। গিরুং বন্দর (Gyirong Port) এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আংশিক স্বাভাবিক হলেও, বন্দরের দিকের সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। নেপালেও উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে নদীর ধারের একাধিক জেলায়। প্রশাসন জাতীয় সড়কে যাতায়াতে বিধিনিষেধ জারি করেছে, হালকা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে ধস নামারও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইতিমধ্যেই নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি জোরদার করা এবং বিপর্যয় পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নতির নির্দেশ দিয়েছেন। এই মুহূর্তে গোটা হিমালয় অঞ্চলের নজর সেই হ্রদের দিকেই, যা যে কোনও মুহূর্তে ফের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা জনপদগুলিতে।




