• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 23 August, 2026

ভারতে বৃষ্টিপাতের চরিত্রের ব্যাপক বদল

আগস্ট মাসে নিয়মিত বৃষ্টিপাত না হলে ধান, ডাল, ভুট্টা এবং অন্যান্য খরিফ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার অতিবৃষ্টির ফলে জমির উর্বর মাটি ধুয়ে যায় এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাধারে জল সঞ্চয়, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ, পানীয় জলের সরবরাহ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপরও এই পরিবর্তনের গভীর প্রভাব পড়ছে।

ভারতে বৃষ্টিপাতের চরিত্রের ব্যাপক বদল

Image: ANI

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির বণ্টন অত্যন্ত অসম হয়ে উঠেছে। কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে একই সময়ে একদিকে নদী উপচে পড়ছে, অন্যদিকে কৃষিজমিতে সেচের জন্য পর্যাপ্ত জল পাওয়া যাচ্ছে না। এই অসম বৃষ্টিপাত আবহাওয়ার পূর্বাভাসকেও আরও জটিল করে তুলছে। ভারতের বর্ষাকে প্রভাবিত করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলো এল নিনো (El Niño)। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এল নিনো সক্রিয় থাকলে সাধারণত ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টিপাত কমে যায়। ২০২৬ সালের আগস্ট–সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনাও প্রকাশ করা হয়েছে।

বর্ষাকে প্রভাবিত করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া হলো ম্যাডেন–জুলিয়ান অসিলেশন (Madden–Julian Oscillation বা MJO)। এটি নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপর দিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হওয়া মেঘ, বৃষ্টিপাত, বায়ুচাপ এবং বায়ুপ্রবাহের একটি বৃহৎ ব্যবস্থা। সাধারণত ৩০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে এটি পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে এবং এর গতিপথকে আটটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়।

যখন এমজেও ফেজ–২ বা ফেজ–৩-এ থাকে, তখন ভারত মহাসাগরের উপর সক্রিয় মেঘমালা গঠিত হওয়ায় ভারতের বর্ষা শক্তিশালী হয়। কিন্তু ফেজ–৬-এ অবস্থান করলে সেই সক্রিয় অঞ্চল পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায়। ফলে ভারতের উপর মৌসুমি বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিস্তৃত অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। ভারত একটি মৌসুমি জলবায়ুর দেশ। দেশের মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মাধ্যমে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সংঘটিত হয়। কৃষি, পানীয় জল, নদী-নালা, জলাধার, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতি এই বর্ষার উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বর্ষার একটি নির্দিষ্ট ছন্দ ছিল— জুন মাসের শুরুতে মৌসুমি বায়ুর আগমন, চার মাস ধরে বৃষ্টিপাত এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার বিদায়। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই পরিচিত ছন্দ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আবহাওয়াগত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ভারতের বর্ষা এখন আরও অনিশ্চিত, অসম এবং চরম প্রকৃতির হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে ভারতের বর্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো বৃষ্টিপাতের ধরন। আগে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টিপাত বেশি দেখা গেলেও এখন অল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত এবং তারপরে দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক মাসের সমান বৃষ্টি হচ্ছে, আবার অন্য অঞ্চলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বৃষ্টির দেখা মিলছে না। ফলে একই মৌসুমে কোথাও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস, আবার কোথাও খরা ও জলসংকট দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু আবহাওয়াকে নয়, কৃষি, জলসম্পদ এবং নগর ব্যবস্থাপনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বর্তমান বর্ষা পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডল আগের তুলনায় বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলেই স্বল্প সময়ে প্রবল বর্ষণ ঘটে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীন আবহাওয়াও সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও বাড়তে পারে এবং বর্ষার অনিশ্চয়তা আরও বৃদ্ধি পাবে।ভারতের খরিফ কৃষি মূলত বর্ষার উপর নির্ভরশীল। আগস্ট মাসে নিয়মিত বৃষ্টিপাত না হলে ধান, ডাল, ভুট্টা এবং অন্যান্য খরিফ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার অতিবৃষ্টির ফলে জমির উর্বর মাটি ধুয়ে যায় এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাধারে জল সঞ্চয়, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ, পানীয় জলের সরবরাহ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপরও এই পরিবর্তনের গভীর প্রভাব পড়ছে। শহরাঞ্চলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা, নিকাশি ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং আকস্মিক নগর বন্যার ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবর্তিত বর্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, কার্যকর জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বর্ষা আজ একটি পরিবর্তনের যুগে প্রবেশ করেছে। মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণের চেয়ে কখন, কোথায় এবং কত দ্রুত বৃষ্টি হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনো এবং ম্যাডেন–জুলিয়ান অসিলেশনের সম্মিলিত প্রভাবে বর্ষা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নই ভবিষ্যতের জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রধান পথ।