• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 19 August, 2026

কোনটি বেশি জরুরি, শিক্ষা না তার ফলাফল

ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর সাফল্য সম্পূর্ণ কোচিং কেন্দ্র ভিত্তিক। ফলে পরীক্ষার্থীদের যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না।

কোনটি বেশি জরুরি, শিক্ষা না তার ফলাফল

Photo: AI

ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর সাফল্য সম্পূর্ণ কোচিং কেন্দ্র ভিত্তিক। ফলে পরীক্ষার্থীদের যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না।’ লোকসভায় সরকারি পরীক্ষায় কারচুপি প্রতিরোধ আইন সংক্রান্ত আলোচনায় এই কথা বলেছেন টিডিপি সাংসদ। জাতীয় স্তরে কোচিং নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠনে সম্প্রতি জোর দিয়েছে সরকারের দুই শরিক টিডিপি ও শিবসেনা (শিণ্ডে)। নিটের পরীক্ষা বছরে একাধিক বার করার পক্ষেও সওয়াল করেছেন তাঁরা। বিলে একাধিক সংস্কারের ডাক দিয়েছে দুই শরিক দল, যা চিন্তা বাড়িয়েছে সরকারের। টিডিপি সাংসদ বছরে একাধিক বার (অন্তত দু’বার) নিটের ব্যবস্থা করায় জোর দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি এই যে, বর্তমান ব্যবস্থায় পরীক্ষার দিনে পরীক্ষার্থীর যদি পরিবারের কেউ মারা যান, তা হলেও তাঁকে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়। পেশায় চিকিৎসক, শিবসেনা (শিণ্ডে)  সাংসদ  মনে করেন, কেন বছরে একটি দিনে পরীক্ষা হবে? অন্যান্য দেশে পরীক্ষা বছরে একাধিক বার দেওয়া যায়। এতে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপও কমবে। নিট-এ সাফল্য পাওয়ার প্রশ্নে কোচিং নির্ভরতার সমালোচনা করেন দুই শরিক সাংসদই। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমানে কোচিং কেন্দ্রগুলি চড়া অর্থের বিনিময়ে পড়ুয়াদের ভর্তি নেয়, যা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে একটি কাঠামো গঠন প্রয়োজন।
বর্তমানে কোচিং কেন্দ্রের বাজার মূল্য ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে গিয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে তা এক লক্ষ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। বেশ কিছু কোচিং সেন্টার টাকা তুলতে এতটাই ব্যস্ত যে, শেয়ার বাজারে আইপিও এনে টাকা তোলার কথা ভাবছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোচিং কেন্দ্রে পড়লে তবে নিটে সাফল্য পাওয়া যায়। তাই অর্থের অভাবে যোগ্য পড়ুয়ারা নিটে সাফল্য পাচ্ছেন না। অথচ কোচিংয়ের সাহায্য নিয়ে সফল হচ্ছেন মধ্যমেধার পড়ুয়ারা। কোচিং সেন্টারের অস্বাভাবিক বিস্তার একটি জ্বলন্ত সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। দেশের শহর থেকে গ্রাম— সব জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার চেয়ে ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবণতা শিক্ষাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিণত করেছে, যেখানে ‘ভালো নম্বর’ পাওয়াই মূল লক্ষ্য, জ্ঞান অর্জন নয়। কোচিং সংস্কৃতির এত বাড়বাড়ন্ত হল কেন? কোনও সমাজে হঠাৎ করে এমন একটি নির্ভরশীলতা তৈরি হয় না। এর পিছনে অবশ্যই থাকে কাঠামোগত কিছু সমস্যা। অনেক শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করতে পারেন না, অনেকে আবার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না। এক জন শিক্ষকের কাছে যখন ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী থাকে, তখন ব্যক্তিগত- ভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টারের দিকে ঝোঁকে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। এই কাঠামোয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এমন একটি সহায়ক ব্যবস্থার খোঁজ করে যা তাদের প্রশ্নপত্রের ধরন, সম্ভাব্য প্রশ্ন, শর্টকাট টেকনিক ইত্যাদি শেখাবে, তাও আবার তুলনামূলক- ভাবে অনেক কম খরচের বিনিময়ে। কোচিং সেন্টারগুলি ঠিক এই জায়গাটিতেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সফল হওয়ার কৌশলের পাশাপাশি এমন কিছু শেখায়, যা অনেক সময় স্কুলের বা বাড়ির গৃহশিক্ষকের পাঠদানে অনুপস্থিত থাকে। তবে কোচিং সেন্টারের এই রমরমার পিছনে অভিভাবকদের মানসিকতাও অনেকাংশে দায়ী। অনেক অভিভাবকই মনে করেন যে, কোচিং সেন্টারে না দিলে ভাল ফল সম্ভব নয়। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষক ক্লাসে যা পড়িয়ে যান, সবাই তা সমান ভাবে গ্রহণ না-ও করতে পারে, সেটা শিক্ষকের দোষ নয়, পড়ুয়াটিরও নয়। যে সেটা পারে না বা ততটা মনোযোগী নয়, আর যার বাড়িতেও পড়া দেখিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত কেউ নেই, সে কী করবে? একটা সময় পর্যন্ত তারা পিছিয়েই থাকত। এখন অভিভাবকদের সচেতনতা বেড়েছে, তাই গৃহশিক্ষক রাখার মৌলিক একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে। এমনকি যেসব শিশু বাড়ির লোকের কাছে পড়তে চায় না, তাদের জন্যও আসছেন গৃহশিক্ষক। প্রাথমিকভাবে এই ছাত্ররা হয়তো পাড়ার বড় দাদা-দিদি, কাকা, পিসিদের কাছেই পড়ে। কিন্তু যত উঁচু ক্লাসে ওঠে, ততই লেখাপড়া কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক হতে থাকে। নিয়মিত চর্চায় না থাকলে উপযুক্ত পাঠ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই দেখিয়ে দেওয়ার, বুঝিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত লোক কাছাকাছি না পেলে স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। নিজের স্কুলের মাস্টারমশাই তাকে বিনামূল্যে পড়াতে পারেন, কিন্তু অন্য স্কুলের শিক্ষক তাকে সেভাবে কেন পড়াবেন? তা ছাড়াও অধিক মেধাবী ছাত্রদের জন্য উন্নততর পাঠ ও অনুশীলন, যা নিয়মিত ক্লাসে সম্ভব নয়, তার জন্যই বা ছাত্ররা কোথায় যাবে? মানে অনগ্রসর ছাত্রকে এগিয়ে আনতে, ভাল ছাত্রকে আরও ভাল করে তুলতে গৃহশিক্ষকের দরকার পড়ে। উল্টো দিক থেকে ভাবলে, মাস্টারমশাইরা না পড়ালে যদি এই ছাত্ররা পিছিয়েই থাকে, তা হলেই বা কী ভালো হবে! একটা সময় যখন শিক্ষকদের বেতন ছিল খুবই স্বল্প, তখন সঙ্কটের মোকাবিলা করে সংসার নির্বাহের জন্য শিক্ষকদের বাড়তি রোজগারের বিষয়টিও অযৌক্তিক মনে হত না।
গৃহশিক্ষকতার পক্ষে বলা হয়, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে যত্ন করে পড়ান না। যথাসময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করেন না। এই ফাঁক পূরণের জন্যই পড়ুয়ারা কোচিং সেন্টারে বা গৃহশিক্ষকদের কাছে যেতে বাধ্য হয়। আবার বর্তমানে বিদ্যালয়গুলিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকাটাও একটা বড় কারণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এখনও যেখানে যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষক আছেন, সেখানেও পড়ুয়ারা প্রাইভেট টিউশনের উপরেই নির্ভর করে। আমাদের সমাজ ও সরকারকে ভাবতে হবে মূল প্রশ্নটি সম্পর্কে— কেন শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয়ের মধ্যেই পড়ুয়াদের চাহিদা পূরণ করা যাবে না? আমাদের রাজ্যেই মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার সময় যেসব আশ্রমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি সাফল্যের শীর্ষে উঠে আসে, সেখানের পড়ুয়ারা কোনও প্রাইভেট টিউশন নিতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই তাদের তৈরি করে দেওয়া হয়। তাহলে সরকারি ও সরকারপোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কেন অনুরূপ দায়িত্ব পালন করবে না? সমস্যা শুধু সরকারি বেতনভোগী শিক্ষকরা গৃহশিক্ষকতা করছেন বলে নয়, মূল সমস্যা সমান্তরাল প্রাইভেট টিউশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
বর্তমানে প্রত্যন্ত স্থানের স্কুলগুলির অবস্থা কেমন, সে কথা রাজ্যবাসী জানেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও তো মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হচ্ছে। ভালো নম্বর নিয়ে ছেলেমেয়েরা পাশও করছে। সেই কৃতিত্বের দায় কার— সরকারের না গৃহশিক্ষকের, তা নিয়ে একটা বিতর্কের অবকাশ থেকে যায়। স্বাধীনতার আগে থেকে আজ পর্যন্ত বহু শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে।
আজ গৃহশিক্ষকতার বাড়বাড়ন্তের মূল কারণ, সরকারি ঔদাসীন্য। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পুরোপুরিই ‘প্রাইভেট টিউশন’-নির্ভর। সেই সব শিক্ষণ কেন্দ্রে কারা পড়ান— নানা স্তরের শিক্ষকরাই তো! নাহলে ছেলেমেয়েদের নিট, জেইই, গেট, এই সব পরীক্ষার জন্য তৈরি করবেন কারা? তাই লেখাপড়ার মানের অবনতির হাজারটা কারণ ছেড়ে শুধু শিক্ষকদের ‘প্রাইভেট পড়ানো’র দিকে নজর দেওয়া সমস্যার অতিসরলীকরণ মাত্র।
শিক্ষকদের অবশ্যই উচিত ছাত্রকে লেখাপড়ায় কিছুটা স্বনির্ভর করে তোলা। স্কুলের পরিকাঠামো উন্নত হলে শিক্ষকের পক্ষে ক্লাসেই অনেকটা করিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাই সরকারের তরফ থেকে শাস্তির বদলে কিছু গঠনমূলক পদক্ষেপ করা যায়। যেমন— স্কুলে শিক্ষকদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা, এবং পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য স্কুলেই আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আর গৃহশিক্ষকতাকে ‘নিষিদ্ধ’ না করে বরং কোনোভাবে আয়করের আওতায় নিয়ে আসা— যাতে বেকার গৃহশিক্ষকরা কিছুটা সুবিধা ভোগ করেন। দ্বার বন্ধ করে গৃহশিক্ষকতাকে রুখে দেওয়া আসলে কোনও সমাধানই নয়। প্রতিযোগিতামূলক কোচিং-এর ধারণা, কার্যক্রম সম্পূর্ণ আলাদা। তার উদ্দেশ্যও আলাদা। অর্থাৎ, লেখাপড়া শেখা এবং চাকরি পাওয়া— এই দুই মেধাভান্ডার সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এবার এই ব্যবস্থায় যারা সফল হবে, তাদের একাংশ সরকারি চাকরিজীবী হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে। হয়ে উঠবে সরকারেরই এক ক্ষুদ্রতম অংশ, বা নীতি নির্ধারক। তাদের কাছে সরকারি শিক্ষা সম্পর্কে কোন নীতি আমরা আশা করব?

 দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, মূল ধারার বিদ্যালয়গুলি ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে এবং কোচিং সেন্টারের সমান্তরাল সাম্রাজ্য এক রাক্ষুসে পরজীবীর মতো মূল শিক্ষাব্যবস্থাকে গ্রাস করছে। এই বাণিজ্যিক উন্মাদনা কেবল মনেরই মৃত্যু ঘটাচ্ছে না, বরং ২০২৪ সালে দিল্লির কোচিং সেন্টারের বেসমেন্টে জল ঢুকে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তরতাজা প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে। পরিশেষে, বিশাল বস্তায় জুতো-চটি ভরে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে ঢোকা, তা আসলে নম্বরের ইঁদুরদৌড়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সত্তা ও শৈশবকে বিসর্জন দেওয়ার এক মর্মস্পর্শী হাহাকার, যা প্রত্যেককে শিক্ষাব্যবস্থার এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে বাধ্য করে।