• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 17 August, 2026

‘ভারতসেরা বাংলা’

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন সফল করতে হলে প্রয়োজন ‘বিকশিত বাংলা’। কথাটি যুক্তিসঙ্গত। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলার ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে

‘ভারতসেরা বাংলা’

Image: IANS

স্বাধীনতা দিবসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাষণে ‘ভারতসেরা বাংলা’ গড়ার যে আহ্বান উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে বাংলার উন্নয়নে সকলকে একসঙ্গে কাজ করার যে আবেদন তিনি জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার গুরুত্ব রয়েছে। কারণ একটি রাজ্যের উন্নয়ন কখনও শুধু সরকারের একার দায়িত্ব হতে পারে না। সরকার, বিরোধী দল, শিল্পমহল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ— সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই উন্নয়নের ভিত শক্ত হয়।

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন সফল করতে হলে প্রয়োজন ‘বিকশিত বাংলা’। কথাটি যুক্তিসঙ্গত। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলার ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। এক সময় কলকাতা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র। শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক চেতনার ক্ষেত্রেও বাংলা পথ দেখিয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার কথা বলা সহজ, কিন্তু তা বাস্তবে রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।

তাই ‘ভারতসেরা’ হওয়ার স্লোগানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তার বাস্তব রূপরেখা। বাংলায় সবচেয়ে বড় সমস্যা কর্মসংস্থান। শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশকে কাজের জন্য অন্য রাজ্যে যেতে হয়। শিল্পে নতুন বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার, আধুনিক পরিকাঠামো এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থানের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

মুখ্যমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তার কথাও বলেছেন। এই ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন। মহিলাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকারকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে আস্থা তৈরি হয়।

বাংলার উন্নয়নকে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাখলে চলবে না— মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের এই দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় থেকে সমুদ্র, জঙ্গলমহল থেকে তরাই-ডুয়ার্স—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গে পর্যটন, চা, কৃষি ও পরিষেবা শিল্পের বিকাশ যেমন সম্ভব, তেমনই জঙ্গলমহলে বনজ সম্পদ, পর্যটন ও ক্ষুদ্র শিল্পের সুযোগ তৈরি করা যায়। দক্ষিণবঙ্গে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও আধুনিক করা প্রয়োজন।

তবে উন্নয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্প্রীতির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান শুধু সাধারণ মানুষের উদ্দেশে নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও প্রযোজ্য। বিরোধীদের মতামতকে সম্মান করা, প্রশাসনে স্বচ্ছতা রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অবদান স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী শ্রীঅরবিন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা ও বীণা দাসের কথা বলেছেন। এই ঐতিহ্য অবশ্যই বাংলার গর্ব। কিন্তু অতীতের গৌরব স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়; সেই গৌরবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বর্তমানের বাংলা গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা।

‘ভারতসেরা বাংলা’ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে পরিণত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান, কৃষি, নারী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা—প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা দরকার। মানুষের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে বড় পথ বক্তৃতা নয়, কাজ।

বাংলার মানুষ নতুন সরকারের কাছে সেই কাজই দেখতে চাইবেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে সরকারের দায়বদ্ধতাও। বাংলা সত্যিই ‘ভারতসেরা’ হবে কি না, তার উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর প্রথম শর্ত একটাই— স্লোগানের সঙ্গে বাস্তব উন্নয়নের মিল ঘটানো।