আজ ভারত পদার্পণ করল স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে। আট দশকের এই দীর্ঘ পথচলা নিছক একটি ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়; এটি একটি চেতনার পুনর্জাগরণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিণত হয়ে ওঠা এবং অগণিত মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট যে স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল, আজ তার উত্তরাধিকার বহন করে ভারত এক নতুন আত্মবিশ্বাসে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। তাই স্বাধীনতার ৮০তম বছরে অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি আগামী দিনের ভারতকে আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তোলার অঙ্গীকারেরও সময়।
স্বাধীনতার মুহূর্তে ভারতের সামনে ছিল অসংখ্য প্রতিকূলতা। দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু সমস্যা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, খাদ্যাভাব, অনুন্নত পরিকাঠামো এবং বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার বিরাট চ্যালেঞ্জ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল কঠিন। কিন্তু স্বাধীন ভারতের নেতৃত্ব গণতন্ত্রকে পথের ভিত্তি করেছিল। সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচেতনা— এই প্রতিষ্ঠানগুলিই ভারতীয় প্রজাতন্ত্রকে স্থিতিশীলতার ভিত দিয়েছে।
আট দশকে ভারতের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, গণতন্ত্র এখানে কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়ে থাকেনি; তা মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। নিয়মিত নির্বাচন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পরিবর্তন এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তির পরিচয় বহন করে। নানা মত, নানা ভাষা, নানা পরিচয় এবং নানা রাজনৈতিক বিশ্বাসের সহাবস্থান সত্ত্বেও ভারত এক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে চলেছে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই ভারতের প্রকৃত শক্তি নিহিত।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার পর ভারত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। কৃষি উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা, শিল্পের প্রসার, সবুজ বিপ্লব, পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং আজকের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি— প্রতিটি পর্যায়ই ভারতের পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, ওষুধ শিল্প, ডিজিটাল পরিষেবা, স্টার্ট-আপ এবং আধুনিক উৎপাদন ক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতা আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। মহাকাশ গবেষণায় সাফল্য থেকে শুরু করে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল জনপরিষেবা ব্যবস্থার অন্যতম নির্মাতা হয়ে ওঠা— এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গর্বের।
তবে স্বাধীনতার ৮০ বছর উদ্যাপনের অর্থ আত্মতুষ্টি নয়। ভারতের সামনে এখনও বহু কাজ বাকি। দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানো, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের আয় ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি, নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ রক্ষা— এসবই আগামী দিনের জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছয়, সেটিই হওয়া উচিত উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
বিশেষত তরুণ প্রজন্মের জন্য ভারতে আরও বেশি সুযোগ গড়ে তুলতে হবে। ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তাঁদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী কয়েক দশক ভারতের জন্য অভূতপূর্ব সম্ভাবনার সময় হয়ে উঠতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক বিজ্ঞান, সবুজ প্রযুক্তি, মহাকাশ, জৈবপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো নতুন ক্ষেত্রগুলিতে ভারতীয় তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
স্বাধীনতার ৮০ বছর আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়— দেশপ্রেম কেবল পতাকা উত্তোলন বা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সৎভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করা, আইনকে সম্মান করা, অন্যের অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং দেশের দুর্বলতম মানুষের পাশে থাকা— এসবই প্রকৃত দেশপ্রেমের প্রকাশ। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।
আজকের ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রগুলির অন্যতম এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারত শান্তি, সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিকতার পক্ষে আরও দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেও বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও গভীর করা সম্ভব।
স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে তাই ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আত্মসমালোচনাও। যে ভারত দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও অনুন্নয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে এত দূর এসেছে, সেই ভারতই আগামী দিনে আরও উন্নত, আরও ন্যায়সঙ্গত এবং আরও মানবিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে। অতীতের গৌরব আমাদের অনুপ্রেরণা দিক, কিন্তু ভবিষ্যতের স্বপ্নই হোক আমাদের চালিকাশক্তি।




