• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 12 August, 2026

গাজার শান্তি-পরিকল্পনা: ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর, বাধা কি অবিশ্বাস?

গাজায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ আবার বড় অনিশ্চয়তার মুখে। হামাস শর্তসাপেক্ষে গাজা থেকে অস্ত্র সরিয়ে

গাজার শান্তি-পরিকল্পনা: ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর, বাধা কি অবিশ্বাস?

Image: ANI

গাজায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ আবার বড় অনিশ্চয়তার মুখে। হামাস শর্তসাপেক্ষে গাজা থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সম্মতি জানিয়েছে। কিন্তু ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হামাস ‘বাস্তবিক অর্থে’ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর ভাষায়, ইজরায়েল ১৫ দফা নথি মেনে নেয়নি।
এর ফলে ট্রাম্পের গাজা শান্তি-পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে— কে আগে পদক্ষেপ নেবে? হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে, না ইজরায়েল সেনা সরাবে?
সমস্যাটি আপাতদৃষ্টিতে সামরিক। কিন্তু গভীরে গেলে এটি মূলত বিশ্বাসের সংকট। দুই পক্ষই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আশঙ্কা করছে, অন্য পক্ষ নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে না। ফলে প্রত্যেকেই চাইছে, অপর পক্ষ আগে ঝুঁকি নিক।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার মূল কাঠামো ছিল এই অচলাবস্থা ভাঙা। হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করা, গাজায় একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা, ইজরায়েলি সেনাকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া এবং শেষে গাজার পুনর্গঠন— পরিকল্পনাটির প্রধান স্তম্ভ এগুলিই।
তত্ত্বগতভাবে এই পরিকল্পনা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। বাস্তবে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হল, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইজরায়েলের সেনা প্রত্যাহার কীভাবে একসঙ্গে ঘটবে।
ইজরায়েলের যুক্তি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার স্মৃতি এখনও তীব্র। সেই হামলায় প্রায় ১,২০০ ইজরায়েলি নিহত এবং ২৫১ জন বন্দী হন। ইজরায়েলের নিরাপত্তা-ব্যবস্থার কাছে ওই ঘটনা গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ফলে হামাস ভবিষ্যতে আবার সামরিক শক্তি সংগঠিত করতে পারবে— এমন কোনও সম্ভাবনা ইজরায়েল মেনে নিতে চাইছে না।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যে সেই অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ‘প্রতীকী’ বা কাগুজে নিরস্ত্রীকরণ চান না। তিনি চান এমন নিরস্ত্রীকরণ, যা বাস্তবে যাচাই করা যাবে। ইজরায়েলের দৃষ্টিতে রকেট, অস্ত্রের ভাণ্ডার, সামরিক উৎপাদনকেন্দ্র এবং সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার বিপজ্জনক।
কিন্তু হামাসের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের বক্তব্য, ইজরায়েল যদি গাজায় সেনা রেখে দেয় এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে অস্ত্র তুলে দেওয়ার অর্থ হবে নিজেদের নিরাপত্তার শেষ অবলম্বনটুকুও ত্যাগ করা। তাই হামাস অস্ত্র সমর্পণকে ইজরায়েলি হামলা বন্ধ এবং সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে
যুক্ত করতে চাইছে। এখানেই শান্তি-পরিকল্পনার
সবচেয়ে বড় জট।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভারী অস্ত্র, অস্ত্রের গুদাম, সামরিক উৎপাদনকেন্দ্র এবং সুড়ঙ্গের তালিকা তৈরি করে সেগুলি নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণের কথা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অস্ত্র সরাসরি ইজরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার কথা নেই। প্যালেস্তাইনি জাতীয় কমিটি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে সেগুলি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রয়েছে।
এটি দুই পক্ষের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার জায়গা তৈরি করতে পারে। হামাসের কাছে অস্ত্র সরাসরি ইজরায়েলের হাতে তুলে দেওয়া আত্মসমর্পণের সমান। আবার ইজরায়েলের কাছে অস্ত্র সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে দেওয়া ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকি। তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র সংরক্ষণ তাই মাঝামাঝি একটি পথ হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, ইজরায়েল কতটা বিশ্বাস করবে যে, এই অস্ত্র আর কখনও ব্যবহার করা হবে না?
অতীতের অভিজ্ঞতা এই অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে। যুদ্ধবিরতির পরেও গাজায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইজরায়েল মনে করে, সুযোগ পেলে হামাস আবার সংগঠিত হতে পারে। অন্যদিকে প্যালেস্তাইনিরা মনে করে, ইজরায়েল নিরাপত্তার অজুহাতে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইতে পারে।
এই পারস্পরিক সন্দেহ দূর না হলে কোনও কাগুজে পরিকল্পনাই সফল হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। নেতানিয়াহুর সরকার দক্ষিণপন্থী শরিকদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পরিকল্পনাটিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে ইতিমধ্যেই আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে নেতানিয়াহু যদি দ্রুত সেনা প্রত্যাহারে সম্মতি দেন, তাঁর নিজের রাজনৈতিক শিবিরেই প্রবল বিরোধিতা দেখা দিতে পারে।
এই কারণে তাঁর অবস্থানকে শুধু সামরিক কৌশল দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসেবও রয়েছে। সামনে ইজরায়েলের নির্বাচন। এমন সময়ে কোনও ধরনের ‘ছাড়’কে বিরোধীরা দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তাই নেতানিয়াহুর পক্ষে কঠোর অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক।
অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্য এই পরিস্থিতি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি গাজা-সংকটের একটি দ্রুত সমাধানকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চান। তাঁর উদ্যোগকে তিনি বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু বন্ধু ইজরায়েলই যদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
তবে নেতানিয়াহু এখনও ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইছেন না। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকান কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ, পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাতিল করার বদলে তার বাস্তবায়নের শর্ত নিয়ে দর-কষাকষির সম্ভাবনাই বেশি।
এখানেই হয়তো সমাধানের পথ।
নিরস্ত্রীকরণ এবং সেনা প্রত্যাহারকে ‘সব অথবা কিছুই নয়’ ধরনের শর্ত না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে হামাস ভারী অস্ত্রের তালিকা তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে সেগুলি নিরাপদ সংরক্ষণে পাঠাবে। একই সময়ে ইজরায়েল নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সেনা সরাবে। পরের ধাপে সুড়ঙ্গ, অস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র ও গুদাম নিষ্ক্রিয় করা হবে এবং ইজরায়েল আরও এলাকা ছাড়বে। শেষ পর্যায়ে অবশিষ্ট অস্ত্র নতুন প্যালেস্তাইনি নিরাপত্তা কাঠামোর হাতে যাবে।
অর্থাৎ, এক পক্ষের প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে অন্য পক্ষের একটি যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ— এই নীতিই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।
এই ব্যবস্থার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। শুধু আমেরিকার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। মিশর, কাতার, আরব দেশগুলি, ইউরোপীয় দেশ এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতো প্রতিষ্ঠানকে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনাও সেই কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন। হামাস যদি সত্যিই প্রশাসনিক ক্ষমতা স্বাধীন প্যালেস্তাইনের প্রযুক্তিবিদদের হাতে তুলে দেয়, তবে সেটি যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সূচনা করতে পারে। কিন্তু প্রশাসন বদলালেই সমস্যা মিটবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুলিশ, বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ এবং অন্যান্য পরিষেবা চালানোর জন্য যে বিপুল মানবসম্পদ প্রয়োজন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গাজার সাধারণ মানুষকে শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। যুদ্ধের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, রাস্তা এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খাদ্য, জল, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট এখনও গুরুতর। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে শুধু নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক সমাধান তৈরি করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
গাজায় শান্তি মানে শুধু হামাসের অস্ত্র কমে যাওয়া নয়। শান্তি মানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়া, যেখানে ইজরায়েলি নাগরিকরা নিরাপদে থাকবেন এবং একই সঙ্গে প্যালেস্তাইনিরাও নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবেন।
এখানেই ট্রাম্পের পরিকল্পনার আসল পরীক্ষা। যুদ্ধ থামানো এক জিনিস, যুদ্ধের পরে একটি কার্যকর রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। পুনর্গঠনের জন্য অর্থ লাগবে, নিরাপত্তা লাগবে, প্রশাসন লাগবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক বৈধতা লাগবে।
তাই নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার শেষ বলে দেখা হয়তো তাড়াহুড়ো হবে। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পনার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি কোথায়। শান্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে, কিন্তু দুই পক্ষের কেউই প্রথম ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে ‘কে আগে’ প্রশ্নটির বদলে ‘কীভাবে একই সঙ্গে’ প্রশ্নটি সামনে আনতে হবে।
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ প্রয়োজন— এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। একইভাবে গাজায় অনির্দিষ্টকাল ইজরায়েলি সামরিক উপস্থিতিও কোনও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হতে পারে না। একটি পক্ষের নিরাপত্তা যদি অন্য পক্ষের স্থায়ী অনিরাপত্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই শান্তি শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে।
গাজার সংকট তাই শুধু একটি যুদ্ধবিরতির সমস্যা নয়; এটি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট— শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা শুধু অস্ত্র নয়, অবিশ্বাস। সেই অবিশ্বাস কাটানোর মতো কার্যকর, যাচাইযোগ্য এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে আরও একটি শান্তি-উদ্যোগ ব্যর্থ হবে।

আর যদি সেই ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তবে দীর্ঘ রক্তক্ষরণের পর গাজার জন্য সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।