ভারতীয় টেবিল টেনিসে বড় ধাক্কা। প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সময়মতো নির্বাচন না করা এবং খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষায় গাফিলতির অভিযোগে টেবল টেনিস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়াকে (TTFI) সাময়িক ভাবে সাসপেন্ড করল ক্রীড়ামন্ত্রক। একই সঙ্গে ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থাকে একটি অ্যাড-হক কমিটি গঠন করে আপাতত দেশের টেবিল টেনিসের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া মন্ত্রকের অভিযোগ, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা হিসাবে যে ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলার কথা, ফেডারেশন তা মানতে ব্যর্থ হয়েছে। মন্ত্রকের নির্দেশ ও নীতিও সংস্থাটি বার বার উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ।
চলতি বছরের শুরুতেই ফেডারেশনকে শোকজ নোটিস পাঠিয়েছিল ক্রীড়া মন্ত্রক। কিন্তু সংস্থার দেওয়া জবাব সন্তোষজনক হয়নি বলেই সূত্রের খবর। তার পরেই বুধবার তাদের সরকারি স্বীকৃতি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে কানপুরে আসন্ন জাতীয় র্যাঙ্কিং টিটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৬ থেকে ২৩ অগাস্ট এই টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা।
মন্ত্রকের নির্দেশে বলা হয়েছে, ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থা আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস সংস্থা ITTF-এর সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা তৈরি করবে। তার মধ্যে একটি অ্যাড-হক কমিটিও গঠন করা হবে। টেবল টেনিস ফেডারেশনে নিয়মমাফিক নির্বাচিত ও স্বীকৃত প্রশাসনিক কাঠামো পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাই ভারতীয় টেবিল টেনিস পরিচালনা করবে।
কিন্তু কেন এত বড় সিদ্ধান্ত নিল সরকার?
ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ক্রীড়া মন্ত্রকের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এ বছর সংস্থার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, এখন সেই প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়নি।
গত কয়েক মাস ধরেই ফেডারেশনের অন্দরে চলছিল তীব্র অস্থিরতা। জানুয়ারিতে সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তথা প্রাক্তন টেবিল টেনিস তারকা কমলেশ মেহতাকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়েছিল।
তবে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন কমলেশ। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁর সাসপেনশন খারিজ করে দেয়। সেই সময় ফেডারেশনের অন্দরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অভিযোগও সামনে আসে।
ফেডারেশনকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়ে ভারতের অন্যতম সেরা টিটি তারকা মনিকা বাত্রাকে এশিয়ান গেমসের দল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে। পর্যাপ্ত সংখ্যক ঘরোয়া ম্যাচ না খেলার কারণ দেখিয়ে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন মনিকা। তাঁর অভিযোগ ছিল, খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফেডারেশনের পদ্ধতি অস্পষ্ট এবং অন্যায্য। এই সমস্ত বিতর্ক এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেই বিষয়টি নজরে আসে ক্রীড়া মন্ত্রকের। পরে ফেডারেশনকে শো-কজ নোটিস পাঠানো হলেও, সংস্থার ব্যাখ্যায় মন্ত্রক সন্তুষ্ট হয়নি।
খেলোয়াড়দের কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ফেডারেশন তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ ক্রীড়া মন্ত্রকের। গত বছর জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনেও দেরি হয়েছিল। সেই ঘটনাকেও খেলোয়াড়দের স্বার্থের প্রতি ফেডারেশনের উদাসীনতার উদাহরণ হিসাবে দেখিয়েছে মন্ত্রক।
এর আগেও গুরুতর প্রশাসনিক বিতর্কে জড়িয়েছিল জাতীয় টেবল টেনিস ফেডারেশন। ২০২২ এর ফেব্রুয়ারিতে মনিকা বাত্রার একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি হাই কোর্ট ফেডারেশনের তৎকালীন নির্বাচন ও দল নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সেই সময় দিল্লি হাই কোর্ট ফেডারেশনকে পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। পরে নতুন নির্বাচন হওয়ার পর ২০২২-এর ডিসেম্বরে ফেডারেশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু চার বছর পর ফের প্রশাসনিক সংকটে পড়ল ভারতীয় টেবিল টেনিসের সর্বোচ্চ সংস্থা।
বর্তমানে ফেডারেশনের সভাপতি মেঘনা আহলাওয়াত, যিনি এই সংস্থার ইতিহাসে প্রথম মহিলা সভাপতি। তিনি হরিয়ানার বিধায়ক দুষ্যন্ত চৌটালার স্ত্রী। দুষ্যন্তের বাবা অজয় সিংহ চৌটালাও অতীতে ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। ভারতীয় টিটি-র প্রশাসনে এই পরিবারতন্ত্র নিয়েও অনেকের আপত্তি রয়েছে।
আপাতত জাতীয় অলিম্পিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক টিটি সংস্থার পরামর্শে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাই সামলাবে দেশের টেবিল টেনিস। তবে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো কবে তৈরি হবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে কবে স্থায়ী কমিটি দায়িত্ব নেবে, সেটাই দেখার।




