পুলিশের হেফাজতে কোনও মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের হাতে, হেফাজতে থাকা একজন মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বও মূলত তাঁদেরই। ফলে হালিশহরে বিরজু কুমারের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, প্রশাসনের কাছে একটি কঠিন প্রশ্নও। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর যে উদ্যোগ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিয়েছেন, তাকে স্বাগত জানানোই উচিত।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টিকে কেবল সহানুভূতির স্তরে আটকে রাখেননি। নিহতের স্ত্রী জেনি শর্মা যখন তাঁর কাছে স্বামীর মৃত্যুর বিচার দাবি করেছেন, তখন সেই দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হালিশহর থানার আইসি-কে ক্লোজ এবং তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কোনও মানুষের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সেই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্তত প্রাথমিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আইসি-কে ক্লোজ করা বা তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করা মানেই তাঁদের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অপরাধের বিচার— দুটি পৃথক বিষয়। তদন্তেই নির্ধারিত হবে বিরজু কুমারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং সেখানে কারও কর্তব্যে গাফিলতি, অত্যাচার বা অন্য কোনও অনিয়ম ঘটেছিল কি না। তাই মুখ্যমন্ত্রী একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসককে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে এলে নিহতের পরিবার যেমন ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পাবে, তেমনই নির্দোষ কেউ থাকলে তাঁরাও অযথা অভিযুক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
এই ঘটনার আর একটি মানবিক দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বামীকে হারিয়ে জেনি শর্মার সামনে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতা। তাঁদের একজনের বয়স মাত্র ন’বছর, অন্যটি আরও ছোট। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য দশ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া নিছক আর্থিক অনুদান নয়— এটি একটি বিপর্যস্ত পরিবারকে নতুন করে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সরাসরি স্থায়ী চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়োগবিধির সীমাবদ্ধতা রয়েছে— এই বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন। সেই কারণে আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাটেনডেন্ট হিসাবে তাঁকে চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী গ্রুপ-ডি পদে যাওয়ার সুযোগ রাখার মধ্যে প্রশাসনিক সহায়তা ও নিয়ম মেনে চলার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনার জন্য দশ লক্ষ টাকা দেওয়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে আর্থিক সাহায্য কখনও বিচারবোধের বিকল্প হতে পারে না। জেনি শর্মাও সেই কথাটিই স্পষ্ট করেছেন— তিনি সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞ, কিন্তু তাঁর প্রধান দাবি স্বামীর মৃত্যুর বিচার। এই দাবি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং ন্যায়সঙ্গত। সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণ বা চাকরি দিয়ে সেই প্রশ্নকে চাপা দেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। বরং এই সহায়তা এবং তদন্ত— দুটি পথ সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাওয়াই কাম্য।
হালিশহরের ঘটনা আরও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে— পুলিশ হেফাজতে থাকা মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত আইনের চোখে তিনি অপরাধী নন। গ্রেপ্তারের পর তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। হেফাজতে অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তার কারণ নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া তাই প্রশাসনিক কর্তব্যেরই অংশ।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এই নীতিটিই প্রতিষ্ঠা করা দরকার। কোনও সরকারের আমলে পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু ঘটলে তার বিচার দাবি করা যেমন বিরোধীদের অধিকার, তেমনই সরকারে থাকা দলেরও কর্তব্য হল অভিযোগকে রাজনৈতিক আক্রমণ বলে উড়িয়ে না দিয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
হালিশহরের মানুষের এখন প্রত্যাশা একটাই— প্রতিশ্রুতি যেন তদন্তের পরিণতিতে পৌঁছয়। তার ফলাফল এমন হোক, যাতে নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের উপর আস্থা রাখতে পারে। সত্য উদ্ঘাটন এবং প্রকৃত দোষীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা– এই পথেই হালিশহরের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্তে পরিণত করা সম্ভব।




