বি-২৯ সুপারফোরট্রেস বোমারু বিমানটি চালাচ্ছিলেন ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপ-এর কমান্ডার কর্নেল পল টিবেটস। লক্ষ্যের কাছাকাছি আসার আগে নিচু দিয়ে অটো পাইলটে ওড়ার পর তিনি উচ্চতা বাড়িয়ে ৩১,০০০ ফুটে নিয়ে যান। হিরোশিমার সময় সকাল প্রায় ৮টা ১৫ মিনিটে ‘এনোলা গে’ শহরের উপর ‘লিটল বয়’ নামের ৯,৭০০ পাউন্ড ওজনের ইউরেনিয়াম গান-টাইপ বোমাটি ফেলে দেওয়া হয়। ধাক্কার ঢেউ এড়াতে টিবেটস তৎক্ষণাৎ বিমানটিকে নিচের দিকে নামিয়ে দেন। ৪৩ সেকেন্ড পরে, সকালের আকাশ কাঁপিয়ে একটি বিশাল বিস্ফোরণ হয়।
বোমাটি শহরের উপর ১,৯০০ ফুট উচ্চতায়, জাপানি দ্বিতীয় সেনাবাহিনীর সৈন্যরা যেখানে পিটি করছিল সেই প্যারেড গ্রাউন্ডের ঠিক উপরে বিস্ফোরিত হয়।বিস্ফোরণের সময় ‘এনোলা গে’ তখন ১১.৫ মাইল (১৮. ৫ কিমি ) দূরে ছিল, তবুও বোমার প্রাথমিক শক ওয়েভটি বিমানের গায়ে আছড়ে পড়ে। প্রথম ধাক্কাটি লাগার পর কর্নেল পল টিবেটস এবং ক্রু-রা ভেবেছিলেন এটি জাপানিদের অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান বা বিমান বিধ্বংসী কামানের গুলি। এর ঠিক পর মুহূর্তেই মাটি থেকে প্রতিফলিত হয়ে দ্বিতীয় একটি শক ওয়েভ বিমানটিতে আঘাত করে। এটি প্রথমটির চেয়ে কিছুটা মৃদু হলেও পুরো বিমানকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ‘লিটল বয়’ বোমার ধ্বংসক্ষমতা প্রায় ১৫ কিলোটন (১৫,০০০ টন) টিএনটি বিস্ফোরণের সমান বলে অনুমান করা হয়।
বিস্ফোরণের মুহূর্তে এটি ছিল একটি শান্ত, রোদ ঝলমলে সোমবারের সকাল। ভোরে একটি এয়ার রেইড অ্যালার্ট বেজেছিল, কিন্তু শুধু একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষক বিমান দেখা যাওয়ায় তা তুলে নেওয়া হয়। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমা শহরটি ছিল প্রাণবন্ত— সৈন্যরা পিটি করছে, লোকেরা সাইকেল চালিয়ে ও পায়ে হেঁটে অফিসে যাচ্ছে, মহিলা ও শিশুরা ফায়ারব্রেক পরিষ্কার করছে।বিস্ফোরণ কেন্দ্রের কাছের মানুষেরা সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়, তাদের দেহ কালো কয়লার মতো পুড়ে যায়।
কাছের পাখিরা আকাশেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কাগজের মতো দাহ্য বস্তু গ্রাউন্ড জিরো থেকে ৬,৪০০ ফুট দূর পর্যন্ত মুহূর্তে জ্বলে ওঠে। সাদা আলোটি একটি বিশাল ফ্ল্যাশের মতো কাজ করে, জামাকাপড়ের গাঢ় রঙের ছাপ চামড়ায় পড়ে এবং দেয়ালে মানুষের অবয়ব পুড়ে যায় (পারমাণবিক ছায়া)।
বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরের মানুষেরা প্রথমে আলো ও তাপ, কয়েক সেকেন্ড পরে কানে তালা লাগানো শব্দ এবং ধাক্কার ঢেউ অনুভব করে। গ্রাউন্ড জিরো থেকে ১ মাইলের মধ্যে প্রায় প্রতিটি বাড়ি ধ্বংস হয় এবং ৩ মাইলের মধ্যে প্রায় সব বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শহরের ১০%-এরও কম বাড়ি বিনা ক্ষতিতে টিকে গিয়েছিল। ১২ মাইল দূরের শহরতলিতেও বাড়ির কাচ ভেঙে যায়।
একই সময়ে শহরের চারদিকে অসংখ্য ছোট আগুন একসঙ্গে জ্বলে উঠে একটি বিশাল, অনিয়ন্ত্রিত মহাদাবদাহ বা ‘ফায়ারস্টর্ম’-এ পরিণত হয়। এর ফলে কেন্দ্রের দিকে বাতাস প্রবল বেগে ধেয়ে আসে। এই আগুনের ঝড় হিরোশিমা শহরের ৪.৪ বর্গমাইল (১১.৪ বর্গ কিলোমিটার) এলাকা গ্রাস করে এবং প্রথম কয়েক মিনিটে যারা পালাতে পারেনি তাদের সবাইকে মেরে ফেলে।
বিস্ফোরণের পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাপান সরকারও বুঝতে পারেনি কী হয়েছে। সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে হিরোশিমার সঙ্গে রেডিও ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে একজন জাপানি অফিসারকে বিমানে করে পাঠানো হয়। তিনি শহর থেকে ১০ মাইল দূরে থাকতেই ধোঁয়ার বিশাল মেঘ দেখতে পান। আক্রমণের প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান রেডিওতে বিশ্ববাসীকে এই হামলার কথা জানান। এই ঘোষণার মাধ্যমেই টোকিওর জাপান সরকার প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে যে, তাদের একটি পুরো শহর কোনও সাধারণ বোমায় নয়, বরং মানব ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বোমার আঘাতে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
বিস্ফোরণের কয়েক দিন পরে চিকিৎসকরা বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে রেডিয়েশন সিকনেস-এর লক্ষণ দেখতে পান। সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীরাও হঠাৎ মারা যেতে থাকে। বিকিরণের কারণে মৃত্যু ৩-৪ সপ্তাহ পরে সর্বোচ্চ সংখ্যায় পৌঁছয় এবং ৭-৮ সপ্তাহ পরে কমতে থাকে। বিস্ফোরণের ২ থেকে ৩ বছর পর থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যান্সার) এবং পরবর্তী দশকগুলোতে থাইরয়েড, স্তন ও ফুসফুসের ক্যান্সারের হার সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। যেসব মায়েরা গর্ভবতী অবস্থায় বিকিরণের শিকার হয়েছিলেন, তাদের সন্তানরা মারাত্মক জন্মগত ত্রুটি ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে কতজন মারা গিয়েছিল। অনুমান করা হয় প্রাথমিক বিস্ফোরণ, তাপ ও বিকিরণে প্রায় ৭০,০০০ জন মারা যায়।ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্যচিত্রের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১২ থেকে ২৩ জন আমেরিকান, ব্রিটিশ ও ডাচ যুদ্ধবন্দিও হিরোশিমায় হামলায় নিহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ১৯৪৫ সালের শেষে মৃতের সংখ্যা ১ লক্ষের বেশি এবং ৫ বছরের মধ্যে মৃতের সংখ্যা ২ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।
দুই দিন পর, ৮ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মাঞ্চুরিয়ায় (যা তখন জাপানি নিয়ন্ত্রণে ছিল) আক্রমণ করে। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার পর, জাপানিদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক হারে লিফলেট বিতরণের কৌশল নেয়। ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলার ঠিক আগে ও পরে জাপানের বিভিন্ন শহরে এই লিফলেটগুলো ফেলা হয়। সেই লিফলেটগুলিতে বলা হয়— ‘আমরা মানুষের তৈরি এ যাবৎকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরকের অধিকারী।
আমাদের নতুন উদ্ভাবিত একটিমাত্র আণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে আমাদের ২০০০টি বিশালাকার বি-২৯ বোমারু বিমান একটিমাত্র অভিযানে যে পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করতে পারত, তার সমান। হিরোশিমায় কী ঘটেছিল তা দেখুন।’আজ হিরোশিমা দিবস শুধু নিহতদের স্মরণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর লক্ষ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ ও অহিংসার একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা। হিরোশিমার ঘটনার স্মরণে বিশ্বজুড়ে শান্তি অনুষ্ঠান, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং শিক্ষামূলক অধিবেশনের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ইয়ারবুক অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে মোট পারমাণবিক অস্ত্রের (ওয়ারহেড) আনুমানিক সংখ্যা ১২,১৮৭টি। তাই হিরোশিমা দিবস আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রসঙ্ঘ, আইক্যান ও নানা শান্তি সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই উপলক্ষকে কাজে লাগিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (টিপিএনডাবলু)-এর মতো চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোকে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানায়।
বৈশ্বিক সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তির এই যুগে, হিরোশিমা দিবস জোরালোভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, কী ঝুঁকির মুখে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব। অতীতকে স্মরণ করা এক অধিকতর সচেতন ভবিষ্যৎ গঠনে সাহায্য করে— এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে ক্ষমতার চেয়ে শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।




