বাংলায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের যে স্বতন্ত্র ধারাটি শতাব্দী ধরে স্বকীয়তায় ভাস্বর, তা বিষ্ণুপুর ঘরানা। খেয়াল ও ধ্রুপদের মেলবন্ধনে রচিত এই ঘরানার মূল নির্যাস লুকিয়ে আছে তান এবং পদের গাম্ভীর্যে। পণ্ডিত অমিরঞ্জন বন্দোপাধ্যায় জন্মেছিলেন এই ঘরানার সুবর্ণ সংস্কৃতির একেবারে কেন্দ্রস্থলে। পিতা খ্যাতনামা সংগীতসাধক পণ্ডিত সত্যকিংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই তাঁর প্রথম সুরের তালিম। গৃহে সংগীতের যে আবহাওয়া তিনি পেয়েছিলেন, তা তাঁকে শৈশব থেকেই এক গভীর সাধনামুখী চেতনার দিকে চালিত করেছিল।
পরবর্তীকালে তিনি আধুনিক ভারতীয় সংগীতের বিদগ্ধ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন এবং বিষ্ণুপুর ঘরানার বিশুদ্ধ রূপটিকে নিজের কন্ঠে ধারণ করেন। তাঁর গায়কীতে কখনো লোক দেখানো চপলতা বা আড়ম্বর দেখা যায়নি। রাগের স্বর রূপায়ণে ছিল এক আশ্চর্য পরিমিতিবোধ এবং ধ্যানমগ্নতা। পুরিয়া ধানেশ্রী, মারবা, ভৈরবী বা দরবারি কানাড়ার মতো গুরুগম্ভীর রাগে তাঁর বিস্তার শুনলে মনে হতো, সুর কেবল কোনও ধ্বনিপ্রবাহ নয়, তা এক আত্মিক উপাসনা।
পণ্ডিত অমিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল একজন মঞ্চসফল কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতের বিরল প্রজ্ঞাসম্পন্ন সঙ্গীতজ্ঞদের একজন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর সংগীতের তত্ত্ব এবং প্রয়োগ— উভয়ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং গুরুমুখী শাস্ত্রীয় শিক্ষা— এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। তিনি বিশ্বাস করতেন সংগীতের রসাস্বাদন কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, তার গভীরে একটি ব্যাকরণগত এবং নান্দনিক বিজ্ঞান কাজ করে। তাঁর রচিত গবেষণা প্রবন্ধ এবং গ্রন্থসমূহ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন কঠোর অথচ অভিভাবকতুল্য। তাঁর হাত ধরে আধুনিক যুগের বহু বিশিষ্ট শিল্পী শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিল পাঠ গ্রহণ করেছেন।
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতক থেকে যে ধ্রুপদী সংগীতের ধারা ভারতীয় উপমহাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে তা নানা ধরনের বিশ্বায়ন এবং সুরের মিশ্রণের মুখোমুখি হয়। দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের এই যুগে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকেও অনেক সময় আপস করতে দেখা গেছে। কিন্তু অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই আপসহীন ধারার অন্যতম দৃঢ় প্রাচীর।
তাঁর গায়নশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সুরবোধ’ ও ‘তানকারি’র অনন্য ভারসাম্য। বিশেষ করে রাগ বিস্তারের সময় তিনি যে ধৈর্য এবং কাঠামোগত বিশুদ্ধতা বজায় রাখতেন, তা শ্রোতাকে এক পরম প্রশান্তির জগতে নিয়ে যেত। তান পরিবেশনের সময় তাঁর কন্ঠের নিয়ন্ত্রণ এবং লয়কারির সূক্ষ্ম কারুকাজ ছিল শিক্ষনীয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন বিশুদ্ধতাকে অক্ষুণ্ণ রেখেও শ্রোতার হৃদয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করা সম্ভব।
জীবনের শতবর্ষ ছুঁয়ে তাঁর এই বিদায় কেবল একটি জীবনাবসান নয়, বরং এটি বাংলা তথা সমগ্র ভারতের সাংস্কৃতিক সমাজের কাছে গম্ভীর সতর্কবার্তা ও প্রশ্ন রেখে যায়। যে বিষ্ণুপুর ঘরানা রামশঙ্কর ভট্টাচার্য, যদুভট্ট থেকে শুরু করে সত্যকিংকর বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে প্রবাহমান ছিল, সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে?
আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে, যেখানে সংগীতের আয়ু কয়েক সেকেন্ডের কন্টেন্টে গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে পন্ডিত অমিয়রঞ্জনের মতো সংগীতসাধকদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তিনি শিখিয়েছেন, সুর তৈরি হয় ত্যাগে, সাধনায় এবং নিরবচ্ছিন্ন চর্চায়– কোনও সস্তায় করতালি পাওয়ার তাড়াহুড়োতে নয়।
পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিরোধানে সংগীতজগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন তাঁর সুরের বিরাট উত্তরাধিকার, রেকর্ড সমূহ এবং তাঁর যোগ্য শিষ্যদের এক দীর্ঘ তালিকা, যাঁরা বিষ্ণুপুরের এই মশালকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।




