• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 7 August, 2026

ভারতের অর্থনীতির সহনশীলতা

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গিয়েছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাণিজ্য

ভারতের অর্থনীতির সহনশীলতা

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গিয়েছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) মূল্যায়নে দেখা গিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ হতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে এই হার যথেষ্ট ইতিবাচক বলেই ধরা যায়। একইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির হারও আশঙ্কার তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও খাদ্য ও জ্বালানির দামে কিছুটা চাপ রয়েছে, তা মূলত সরবরাহজনিত সমস্যার ফল। সার্বিকভাবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস সামান্য হলেও ইতিবাচকভাবে সংশোধিত হয়েছে, যা অর্থনীতির ভিত যে এখনও মজবুত, তারই ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে এমপিসির ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি গ্রহণ যথাযথ বলেই মনে হয়। সুদের হার নিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এখন বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করতে পারে। বরং বর্তমান নীতি বজায় রেখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়। ভারতের অর্থনীতি যে সহনশীল, তা স্পষ্ট। বড় ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কাও এই অর্থনীতিকে খুব সহজে নাড়া দিতে পারছে না। উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে এই ধরনের স্থিতিশীলতা বিরল। কিন্তু শুধুমাত্র এই সাফল্যে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের জন্য শুধুমাত্র বর্তমান শক্তির উপর নির্ভর করলে তা যথেষ্ট নয়।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটার নয়। যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব আগামী কয়েক বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস খুঁজে বের করা। শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ চাহিদার উপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই রপ্তানি বৃদ্ধি, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে আরও জোর দিতে হবে।
ভারতের জনসংখ্যার আকারও এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিপুল জনসংখ্যা যেমন একটি শক্তি, তেমনি তা একটি বড় দায়িত্বও। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই শুধু দ্রুততম প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি হিসেবে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না, বরং আরও উচ্চতর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
সুতরাং ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে যে স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও বিনিয়োগের পথকে আরও শক্তিশালী করা। তাহলেই এই সহনশীলতা ভবিষ্যতের স্থায়ী উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে
উঠতে পারবে।