সর্বভারতীয় ডাক্তারির প্রবেশিকা নিট ইউজি পরীক্ষার প্রশ্লপত্র ফাঁস, নীট পরীক্ষা বাতিল, পরবর্তীতে ছাত্র, যুব, জন-আন্দোলনের কাছে সরকারের সমঝোতা। এই হল বিগত সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবলী। কিন্তু যে ডাক্তারি পড়া নিয়ে এত কাণ্ড, সেই ডাক্তারি পঠপাঠনের বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে সরকারের কিছু চিন্তাভাবনার দরকার আছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার হতাশা এবং কৃতকার্য হওয়ার রঙিন স্বপ্ন দুটোই সমানভাবে অনুধাবনযোগ্য।
ভারতে নীতি আয়োগের পরিকল্পনা অনুযায়ী চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণের জন্য দ্রুত নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ খোলা হয়েছে এবং আরও হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ শিক্ষক, উন্নত ল্যাবরেটরি, হাসপাতালের পরিকাঠামো ও রোগীর সংখ্যা বাড়েনি।
সর্বোপরি দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই। কতিপয় প্রতিষ্ঠানে যাঁরা আছেন, তাঁদের উপর রোগী দেখা, প্রশাসনিক কাজ ও গবেষণার চাপ বেশি থাকায় শিক্ষাদানের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যার মূল ভিত্তি হলো রোগীর শয্যার পাশে বা বেডসাইড শিক্ষা। অনেক নতুন মেডিক্যাল কলেজে রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না। হাতেকলমে দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনা, কোনোরকমে বুড়ি ছোঁয়া করেই অনেক শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর (নিট-পিজি) প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দেয়। ফলে রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা, ক্লিনিক্যাল বিচারবুদ্ধি, রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। তাছাড়াও চিকিৎসা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কিছু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে অত্যধিক ফি নেওয়া হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার মানের পরিবর্তে আর্থিক দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়, যদিও সব বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। যে সমস্ত ছাত্র ছাত্রী অতটা বেশি ফি দিতে অপারগ, তাদের জন্য খোলা রয়েছে চিন, নেপাল, বাংলাদেশ, রাশিয়ায় তুলনামূলক কম খরচে, কম প্রতিযোগিতায় ডাক্তারি পড়ার সুযোগ। প্রতিবছর প্রায় লক্ষাধিক বিদেশ থেকে পড়ে আসা ছাত্র-ছাত্রী ভারতের মূল চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। যেহেতু বিদেশের ওই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত নয়, তাই তাদের জন্য ভারতে ডাক্তারি করতে একটি পরীক্ষায় বসতে হয়। প্রথম দফায় সবাই উত্তীর্ণ না হতে পারলেও একাধিকবারের প্রচেষ্টায় প্রায় সবাই উত্তীর্ণ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অনেকে নিট-পিজি পরীক্ষা দিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পথে পাড়ি দেয়। আজকাল ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার চেয়ে প্রযুক্তির উপর অতিনির্ভরতার দরুন ইন্টারনেট, ডিজিটাল নোট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষায় সহায়ক হলেও, অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনেক সময় স্বাধীনভাবে চিন্তা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাভিত্তিক বাস্তবসম্মত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতাকে দুর্বল করতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন দক্ষতাভিত্তিক চিকিৎসা শিক্ষা চালু করেছে। তবে দেশের বিপুল সংখ্যক মেডিক্যাল কলেজে এই সংস্কার সমানভাবে কার্যকর করতে এখনও ঠিক পেরে ওঠার তাগিদ অনুভব করেনি। ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য করণীয় হল, যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের ধরে রাখা। শিক্ষক চিকিৎসকদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে প্রাইভেট প্রাকটিস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, যেমনটা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে করা হয়েছে। আমাদের রাজ্যেও এসএসকেএম হাসপাতাল ও স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে এমনটা ছিল বাম আমলের প্রথমদিকে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতো অনেক বেশি, যা বর্তমানে অনেকটা নেমে এসেছে। চিকিৎসার মানও নেমে গেছে। অনেক রোগী হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু বা তামিলনাড়ুর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করেন।
পশ্চিমবঙ্গের মেডিক্যাল ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলি পুনরুদ্ধারে একাধিক পদক্ষেপ এখনই শুরু করা প্রয়োজন। বেডসাইড ক্লিনিক্যাল শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করা, মেডিক্যাল প্রশিক্ষণের মান উন্নত করা, কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে ক্লাসে ফেরানোর উদ্যোগ গ্রহণ, প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে পর্যাপ্ত রোগী ও উন্নত পরিকাঠামো নিশ্চিত করা।
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়ন বাড়ানো। উচ্চমানের গবেষণা ও নৈতিক গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা। নিয়মিত ও স্বচ্ছ মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখা। ভারতের চিকিৎসা শিক্ষার মান সর্বত্র সমান নয়। এইমস, পিজিআই, জিপমার, সিএমসি-র মতো প্রতিষ্ঠান এখনও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক তৈরি করছে। তবে অনেক নতুন ও কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, পরিকাঠামো এবং ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার মানে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। তাই মূল সমস্যা হলো সর্বত্র মানের সমতা বজায় রাখতে না পারা, কেবলমাত্র মেডিক্যালে আসন বাড়ানো ও কোটা ভিত্তিক সংরক্ষণ বাড়ানো নয়, সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নত করার প্রয়াসের অভাব। আমাদের রাজ্যের নতুন শিক্ষামন্ত্রী,অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের কার্যকরী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের ফলে মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নতি অবশ্যই সম্ভব।




