• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 29 July, 2026

কনটেন্ট ক্রিয়েশনেই কেরিয়ারের নতুন ঠিকানা

দেশের ১৮-২৪ বছরের ৮৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘ক্রিয়েটর’ বলেই পরিচয় দেন। মহানগর নয়, ছোট ছোট শহর উঠে আসছে নতুন ডিজিটাল মুখ

কনটেন্ট ক্রিয়েশনেই কেরিয়ারের নতুন ঠিকানা

দেশের ১৮-২৪ বছরের ৮৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘ক্রিয়েটর’ বলেই পরিচয় দেন। মহানগর নয়, ছোট ছোট শহর থেকেই উঠে আসছে নতুন ডিজিটাল মুখ। শখ মেটাতে নয়, কনটেন্ট তৈরিই এখন আয়ের পথ, আত্মপ্রকাশের মঞ্চ এবং ভারতের নতুন অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ।
একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও বানানো মানেই ছিল হাতে গোনা কয়েকজন ইউটিউবার বা সোশ্যাল মিডিয়া তারকার একচেটিয়া ক্ষেত্র। সেই সময় এখন অতীত। ভারতের ডিজিটাল মানচিত্রে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে নতুন প্রজন্ম। মোবাইল ফোন, সস্তা ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী আজ নিজেরাই গল্প বলছেন, মতামত জানাচ্ছেন, ব্যবসা গড়ছেন, আবার উপার্জনের নতুন পথও তৈরি করছেন। কনটেন্ট ক্রিয়েশন আর নিছক বিনোদন বা শখ নয়, বহু ভারতীয় তরুণের কাছে সেটাই এখন ভবিষ্যতের পেশা।
২০২৪-এ ইউটিউব ইন্ডিয়ার এক সমীক্ষায় সেই বদলে যাওয়া ছবি ধরা পড়েছে। সমীক্ষা বলছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভারতীয় জেন-জি’দের ৮৩ শতাংশ নিজেদের ‘ক্রিয়েটর’ হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ তাঁরা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার দর্শক নন, বরং ডিজিটাল দুনিয়ার সক্রিয় নির্মাতা। এই পরিসংখ্যান শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নয়, এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানসিকতারও ইঙ্গিত বহন করছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ভৌগোলিক মানচিত্রে। একসময় ডিজিটাল সাফল্যের সমার্থক ছিল মুম্বাই, দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর মতো শহর। এখন সেই ধারণা ভেঙে দিচ্ছেন ইন্দোর, জয়পুর, নাগপুর, পাটনা কিংবা আরও অসংখ্য টিয়ার–২ ও টিয়ার–৩ শহরের তরুণরা। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, লোকজ জীবন কিংবা নিজের এলাকার গল্প নিয়েই তাঁরা পৌঁছে যাচ্ছেন বিশ্ববাসীর কাছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কার্যত শহর-গ্রামের দূরত্ব মুছে দিয়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে কনটেন্ট ক্রিয়েশন কেবল পরিচিতি পাওয়ার মাধ্যম নয়, এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও নতুন দিশা। সমীক্ষা অনুযায়ী, জেন জি’দের প্রায় ৭৫ শতাংশই এই ক্ষেত্রকেই ভবিষ্যতের কেরিয়ার হিসেবে দেখছেন। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এখন শুধুই বিনোদনের জায়গা নয়; স্পনসরশিপ, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে। রিপোর্টে ৫৫ শতাংশ ক্রিয়েটর জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাঁদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছে।
এই দৌড়ে এখনও শীর্ষে ইউটিউব। ৯০ শতাংশেরও বেশি জেন-জি ক্রিয়েটর নিজেদের ভাবনা, জ্ঞান বা প্রতিভা প্রকাশের জন্য এই প্ল্যাটফর্মকেই বেছে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে আঞ্চলিক ভাষার কনটেন্টের জনপ্রিয়তা। বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, তামিল বা ভোজপুরি- মাতৃভাষাতেই তৈরি ভিডিও এখন লাখ লাখ দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে ডিজিটাল দুনিয়ায় স্থানীয় সংস্কৃতিও নতুন করে বিশ্বদরবারে জায়গা করে নিচ্ছে।
পরিবর্তনের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মহিলাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। গত দু’বছরে ইউটিউবে মহিলা ক্রিয়েটরের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানাচ্ছে রিপোর্ট। ফ্যাশন বা বিউটির গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা, রান্না, প্রযুক্তি, ভ্লগিং, স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-নানাবিষয়ে তাঁরা কনটেন্ট তৈরি করছেন। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীদের উপস্থিতি যেমন বাড়ছে, তেমনই বিস্তৃত হচ্ছে বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকারও ডিজিটাল দক্ষতার উপর জোর দিচ্ছে। কেন্দ্র ১৫ হাজার মাধ্যমিক স্কুল এবং ৫০০ কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব গড়ে তোলার ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য, আগামী দিনের অ্যানিমেশন, গেমিং, ভিজুয়াল এফেক্টস এবং কনটেন্ট শিল্পের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। তবে এই উত্থানের সঙ্গে বাড়ছে দায়িত্বও। ভুল তথ্য ছড়ানো, অ্যালগরিদমের চাপ কিংবা শুধুমাত্র ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা, এগুলিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে গেলে ভিউয়ের সংখ্যা নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা, মৌলিকতা এবং দায়িত্বশীল কনটেন্টই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ভারতের ‘ক্রিয়েটর ইকোনমি’ আজ আর কয়েকজন তারকা ইউটিউবারের সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের উত্থানের ইতিহাস, যারা নিজের ভাষা, নিজের পরিচয় এবং নিজের স্বপ্নকে ডিজিটাল পর্দায় তুলে ধরে বদলে দিচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সংজ্ঞা। স্ক্রল আর ভিডিওর এই যুগেই তৈরি হচ্ছে ভারতের আগামী দিনের নতুন কর্মক্ষেত্র-যেখানে কনটেন্টই পুঁজি, আর সৃজনশীলতাই সবচেয়ে

বড় শক্তি।