নিট-ইউজি পরীক্ষায় রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করা ১০০ জন কৃতী ছাত্রছাত্রীকে নবান্নে বিশেষ সংবর্ধনা দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সর্বভারতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনকারী পড়ুয়াদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কৃতী ছাত্রছাত্রী, তাঁদের অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কৃতী ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, নিটের মতো কঠিন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করা সহজ নয়। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং পরিবারের সহযোগিতার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। তিনি বলেন, এই সাফল্য শুধুমাত্র ওই ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি গোটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য গর্বের বিষয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আজ এখানে উপস্থিত থাকা এই ১০০ জন ছাত্রছাত্রী বাংলার গর্ব। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, কলকাতা থেকে কোচবিহার—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তোমরা এসেছ। তোমাদের এই সাফল্য প্রমাণ করেছে, বাংলার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিভার কোনও অভাব নেই। সঠিক সুযোগ, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে তাঁরা দেশের যেকোনও প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।’
তিনি কৃতী পড়ুয়াদের পাশাপাশি তাঁদের বাবা-মা, পরিবারের সদস্য এবং শিক্ষকদেরও ধন্যবাদ জানান। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘একজন ছাত্রের সাফল্যের পিছনে শুধু তার নিজের পরিশ্রম থাকে না, পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের দিশা এবং সমাজের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’ শুভেন্দু অধিকারী বলেন, চিকিৎসা পেশা শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়, এটি মানুষের সেবা করার একটি বড় দায়িত্ব। আগামী দিনে এই ছাত্রছাত্রীরা চিকিৎসক হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং মানবিকতার সঙ্গে কাজ করবেন—এই আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তব্যে স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জীবনে কখনও থেমে গেলে চলবে না। তাঁর বক্তব্য, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে যুবসমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।এরপর রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এমন একটি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তৈরি করতে চাইছে, যেখানে সাধারণ মানুষ আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পাবেন এবং আগামী প্রজন্মের চিকিৎসকরাও বিশ্বমানের পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো নয়, চিকিৎসার মান উন্নত করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে বড় হাসপাতাল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পরিষেবা আরও শক্তিশালী করতে হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে চিকিৎসা পরিষেবার পার্থক্য কমিয়ে আনাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।’
তিনি জানান, রাজ্যে চিকিৎসা শিক্ষার পরিকাঠামো আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, পশ্চিম বর্ধমান এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে আরও একটি বড় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিষয়েও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর উদ্যোগে ২০০০ শয্যার একটি বড় হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০০০ শয্যা আর্থিকভাবে দুর্বল ও সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালে স্ক্যান, এমআরআই, ডায়ালিসিস ইউনিট, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা চালু করা হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আরও ভালো কর্মপরিবেশ তৈরির উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
এসএসকেএম হাসপাতালের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের বড় হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।তিনি আরও বলেন, “শুধু কলকাতা নয়, বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও যাতে উন্নত চিকিৎসা পান, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার নিরন্তর কাজ করে চলেছে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক ডা. হরিকৃষ্ণ বেরা, উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়,মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের প্রধান সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম,স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার,স্কুল শিক্ষা দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব বিনোদ কুমার।
অনুষ্ঠানের শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কৃতী ছাত্রছাত্রীদের হাতে স্মারক ও উপহার তুলে দেন। তিনি তাঁদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে বলেন, এই প্রজন্মই আগামী দিনে বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।