নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার নানাবিধ অনিয়মের প্রতিবাদে সাম্প্রতিক দেশজোড়া ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি নির্মমতার অভিযোগে কড়া পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, যেসব আন্দোলনকারী পড়ুয়ার আগে থেকে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড বা ব্যাকগ্রাউন্ড (Criminal Antecedents) নেই, তাদের অবিলম্বে জেল বা হেফাজত থেকে মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে, কোনো অপরাধের ইতিহাস না থাকা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আপাতত কোনো কঠোর বা বলপ্রয়োগমূলক পদক্ষেপ (Coercive Action) গ্রহণ করা যাবে না বলেও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
দেশজুড়ে চলা এই ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, পেলেট গান (Pellet Guns) এমনকি ইলেকট্রিক শক্ ব্যাটন ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ অত্যন্ত মারাত্মক এবং এর একটি অবাধ, নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। গোটা ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি (Special Investigation Team) গঠনের সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনের ডিভিশন বেঞ্চ।
অত্যাচারীর স্থান আইনেই
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্ত অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, শান্তিপূর্ণ ও আইনি উপায়ে আন্দোলন করার অধিকার ভারতের সংবিধানে মৌলিক অধিকার (Fundamental Right) হিসেবে স্বীকৃত। যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে থাকে, নিরপরাধ মানুষের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়, আইন তার নিজস্ব গতিতেই ব্যবস্থা নেবে। দায়বদ্ধতা না নিলে বা জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা না থাকলে তদন্তের কোনও অর্থই থাকে না।
পিটিশনকারীদের তরফে আইনজীবী শদান ফরাসত ও অন্যান্য অভিজ্ঞ আইনজীবীরা অভিযোগ জানান যে, সংসদ অভিমুখে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার সময় পুলিশ চরম বলপ্রয়োগ করেছে। এমনকি মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। পেলেট গান হামলার জেরে এক তরুণের চোখের দৃষ্টি গিয়েছে, বেশ কয়েকজন ছাত্রী ও সাংবাদিক পুলিশি নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। বিহারের সিওয়ানে একে-৪৭ (AK-47) দিয়ে গুলি চালানো হয়েছে বলেও আদালতে সওয়াল করা হয়।
সলিসিটর জেনারেল (Solicitor General) তুষার মেহতা কেন্দ্রের পক্ষে সওয়াল করে জানান, কেন্দ্র সরকারও পড়ুয়াদের ওপর হামলাকে হাল্কাভাবে দেখছে না। তবে এর পাশাপাশি প্রায় ২৫০ জন পুলিশ কর্মীও আহত হয়েছেন এবং আন্দোলনস্থলের ভিড়ে দুষ্কৃতীরা ঢুকে পড়ে এই হিংসা ছড়িয়ে থাকতে পারে বলে তিনি অনুমান প্রকাশ করেন।
ডিজিটাল তথ্য ও প্রমাণ
তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে কোনও তথ্য প্রমাণ লোপাট রুখতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। প্রথমত, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের সমস্ত রাজ্য, বিশেষত দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও কেরালামকে আন্দোলন সম্পর্কিত সব ধরনের সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage), ড্রোন ভিডিও, পুলিশ কর্মীদের বডি-ক্যামেরা রেকর্ডিং (Body-Worn Camera) ও কন্ট্রোল রুমের ওয়্যারলেস লগ সুরক্ষিত রাখতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গোপনীয়তা রক্ষা (Digital Privacy)। আটক বা গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত বা ডিজিটাল তথ্য কোনওভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না বলে রাজ্যগুলিকে সতর্ক করেছে বেঞ্চ। তৃতীয়ত, রাজ্যগুলিকে নোটিশ। দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্র সরকার ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ-সহ আটটি রাজ্যকে নোটিশ জারি করে জবাব তলব করেছে আদালত।
সামগ্রিকভাবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পুলিশের ওপর হামলা এবং ছাত্রদের ওপর বলপ্রয়োগ— দুই দিকেরই নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক তদন্ত (Scientific and Evidence-based Probe) হবে। আগামী শুনানিতেই কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির বক্তব্য পর্যালোচনা করে এসআইটি সংক্রান্ত চূড়ান্ত নির্দেশপত্র প্রকাশ হতে পারে।




