জঙ্গলমহলের মানুষদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন করতে হবে, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যের পরিকাঠামো সবটা ঠিক করতে হবে। এই মুহূর্তে এটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এমনটাই বললেন নয়াগ্রামের বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী অমিয় কিস্কু। ২০২৬ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর পেশায় শিক্ষক ও দীর্ঘদিনের আরএসএস কর্মী অমিয় কিস্কু দৈনিক স্টেটসম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা, জঙ্গলমহলের উন্নয়ন এবং আদিবাসী সমাজ নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রশ্ন: আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর রয়েছে। মন্ত্রী ও বিধায়ক হওয়ার পেছনের যাত্রাপথ সম্পর্কে জানতে চাইব।
অমিয় কিস্কু: রাজনীতির প্রতি আমার প্রথম থেকেই আগ্রহ ছিল। এই যাত্রাপথে অনেক বাধা এসেছে, লড়াই করতে হয়েছে। তবে আমার থেকেও এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা আরও দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করছেন। ভারতীয় জনতা পার্টি আমাকে জায়গা দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ধীরে ধীরে হলেও আজ এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি।
প্রশ্ন: শিক্ষকতার পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা, তারপর মন্ত্রিত্ব ও বিধায়ক পদ—কতটা কঠিন ছিল এই পথচলা?
অমিয় কিস্কু: শুরু থেকেই রাজনীতির পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অন্য একটি রাজনৈতিক দল পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। তাদের পরাজিত করে এই জায়গা তৈরি করা সহজ কাজ ছিল না। তবে দলের প্রত্যেক নেতা-কর্মী কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সেই কারণেই আজ আমরা এই জায়গায় পৌঁছেছি। রাজ্যের গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। মানুষ আমাদের উপর ভরসা রেখেছেন বলেই আমরা সরকার গঠন করতে পেরেছি।
প্রশ্ন: আপনি জঙ্গলমহলের মানুষ। সেই এলাকার বাসিন্দাদের অভাব-অভিযোগের কথা আমরা শুনেছি। এই মুহূর্তে কাজের প্রধান অগ্রাধিকার কী?
অমিয় কিস্কু: জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করতে হবে। আদিবাসী পড়ুয়াদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে আগে গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতকে। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। এতদিন আমাদের দল সরকারে ছিল না। অন্য রাজনৈতিক দল পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। উন্নয়ন একেবারেই হয়নি, তা বলব না। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কাজই বাকি রয়েছে। এখন বিজেপি সরকার গঠন করেছে। ধীরে ধীরে সব হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে জঙ্গলমহলের আদিবাসী মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মানে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। এবার সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, হাসপাতালের পরিকাঠামো দুর্বল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে নয়াগ্রামে। সব দিকেই নজর দিতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে কতটা উন্নয়ন হয়েছে, সেটাও দেখতে হবে। সময় লাগবে, তবে উন্নয়ন হবেই।
প্রশ্ন: কৃষকদের সার্বিক উন্নতির জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে?
অমিয় কিস্কু: সারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোন মাটিতে কোন ধরনের ফসল সবচেয়ে ভালো হবে, সেই বিষয়ে কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দিতে হবে। এই ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের সরকার দ্রুত কাজ শুরু করেছে। তবে তাড়াহুড়োর মধ্যেও পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, কৃষকদের কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য করা এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিষয়গুলি আমি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নজরে আনব। আমাদের রাজ্যে প্রচুর চাষযোগ্য জমি রয়েছে। সেই জমিগুলিতে কৃষিকাজই হবে, অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। চাষের প্রতি যে অনীহা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজ্যে এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকার। ফলে প্রধানমন্ত্রী কিষাণ যোজনা এবং কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষক-কল্যাণমূলক সমস্ত সুযোগ-সুবিধা রাজ্যের কৃষকরাও পাবেন। একটু ধৈর্য ধরতে হবে।
প্রশ্ন: আপনি নিজে পেশায় শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। রাজনীতিতে শিক্ষকদের আরও বেশি করে এগিয়ে আসার বিষয়ে কী বলবেন?
অমিয় কিস্কু: সমাজসেবা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে। তার জন্য শিক্ষক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। শিক্ষক না হয়েও রাজনীতিতে আসা যায়। তবে লক্ষ্য স্থির থাকতে হবে। রাজনীতি মানেই খারাপ—এই ধারণা মন থেকে দূর করতে হবে। শিক্ষক, চিকিৎসক বা অন্য যে কোনও পেশার মানুষ রাজনীতিতে আসতে পারেন। সমাজের জন্য কাজ করার ইচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প নিয়ে আলাদা করে কোনও ভাবনা রয়েছে?
অমিয় কিস্কু: অবশ্যই রয়েছে। সম্প্রতি কল্যাণী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোচনাসভায় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ফল ও সবজি সংরক্ষণ করে কীভাবে মূল্য সংযোজন করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর সাহায্যে কিছু পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হবে। সময় এলে বিস্তারিত জানানো হবে।




