• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 22 July, 2026

‘বিদ্যুৎ প্রহরী’ অ্যাপেই বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে বড় অভিযান, জিরো টলারেন্সের বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

বিদ্যুৎ পরিষেবায় বড় রদবদলের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, ‘লোডশেডিং নয়, উন্নত পরিকাঠামোই হবে লক্ষ্য’

‘বিদ্যুৎ প্রহরী’ অ্যাপেই বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে বড় অভিযান, জিরো টলারেন্সের বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

Image: Biswajit Ghoshal

বিদ্যুৎ চুরি রুখতে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করল রাজ্য সরকার। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ পরিষেবাকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার সল্টলেকের বিদ্যুৎ ভবনে বিদ্যুৎ দপ্তরের পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত থেকে তিনি উদ্বোধন করেন ‘বিদ্যুৎ প্রহরী’ নামে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি বিদ্যুৎ চুরি, বেআইনি সংযোগ এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারবেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী গার্গী ঘোষ, বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রধান সচিব শান্তনু বসু, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার  চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর, পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের  শীর্ষ আধিকারিকরা, বিদ্যুৎ দপ্তরের বিভিন্ন সংস্থার আধিকারিক, বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার রাঠোড অমিতকুমার ভরত সহ একাধিক প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত মন্ত্রী, আধিকারিক এবং বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ এমন একটি পরিষেবা যেখানে ২৪ ঘণ্টাই দায়িত্ব পালন করতে হয়। এখানে কোনও ছুটি, উৎসব বা নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। সামান্য অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই এই দপ্তরের প্রতিটি কর্মীর দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একটি আধুনিক রাজ্যের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা। চিকিৎসা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ভূমিকা অপরিসীম। সেই কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন এবং বণ্টন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
পর্যালোচনা বৈঠকে বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও একাধিক নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও নতুন সাব-স্টেশনের প্রয়োজন রয়েছে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে দ্রুত জমি চিহ্নিত করে নতুন সাব-স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ থাকলেও পর্যাপ্ত সাব-স্টেশন না থাকায় লো-ভোল্টেজের সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটও হয়। এই পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার নির্দেশ দেন তিনি।
একইসঙ্গে শহরাঞ্চলে ধাপে ধাপে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবলিং-এর ওপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের আর্থিক সহায়তা কাজে লাগিয়ে বড় শহর ও পুরসভা এলাকায় ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নয়, আগামী এক বছরের মধ্যে কোন কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেই রূপরেখা তৈরিরও নির্দেশ দেন তিনি।
বিদ্যুৎ চুরি এবং বকেয়া বিল আদায়ে এদিন সবচেয়ে কড়া বার্তা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘হুকিং জিরো করতে হবে। বিদ্যুৎ চুরির ক্ষেত্রে কোনও রকম আপস চলবে না।’ শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেন তিনি। তাঁর কথায়, বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে নোটিস পাঠিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে গৃহস্থ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে মানবিক হওয়ার নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনও পরিবার যদি আর্থিক সমস্যার কারণে বিল দিতে না পারে, তাহলে তাদের অতীত রেকর্ড দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
স্মার্ট মিটার প্রকল্প নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। তিনি জানান, আপাতত সরকারি দপ্তর, সরকারি স্কুল এবং সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে স্মার্ট মিটার চালুর কাজ শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে। স্মার্ট মিটার নিয়ে মানুষের মধ্যে যাতে কোনও ভুল ধারণা না থাকে, তার জন্য সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অনলাইন, হেল্পলাইন এবং বিশেষ গ্রিভ্যান্স সেলের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করার কথা বলেন।
বৈঠকে বিদ্যুৎ দপ্তরের মানবসম্পদ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। ভবিষ্যতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশন এর মাধ্যমে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগসহ অতীতের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যোগ্য প্রার্থীদেরই সুযোগ দিতে হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখতে হবে।
একইসঙ্গে দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মরত আধিকারিক ও কর্মীদের জন্য ট্রান্সফার পলিসি কার্যকর করারও নির্দেশ দেন তিনি। তিন বছরের বেশি সময় ধরে এক জায়গায় কর্মরতদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজন অনুযায়ী বদলির ব্যবস্থা করার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তবে বিশেষ পরিস্থিতি বা মানবিক কারণ থাকলে তা বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।
সরকারি কর্মীদের আর্থিক বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ধাপে ধাপে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই একাংশের ডিএ দেওয়া হয়েছে, বাকি অংশও পর্যায়ক্রমে মিটিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া নতুন বেতন কমিশনের কাজও এগোচ্ছে এবং তার সুপারিশ পাওয়ার পর আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
পর্যালোচনা বৈঠকে নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসঙ্গও উঠে আসে। ‘প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর’ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যাতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধা আরও বেশি মানুষ পেতে পারেন।