১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই— পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক দিন। সেদিন কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে যুব কংগ্রেসের একটি মিছিলকে ঘিরে পুলিশের গুলিতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বহু মানুষ আহত হন। এই ঘটনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর সেই পুরনো ক্ষত যেন আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই রিপোর্ট তুলে ধরে বলেন, দূরে অবস্থান করা জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গুলি চালানোর কোনও প্রয়োজন ছিল না। কমিশনের পর্যবেক্ষণ আরও কঠোর— তারা এই গুলিচালনাকে ‘জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের থেকেও খারাপ’ বলে উল্লেখ করেছে। এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর এবং তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তুলছে।
এই কমিশন গঠিত হয় ২০১১ সালে, তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর। রিপোর্ট জমা পড়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু এতদিন তা প্রকাশ্যে না আসায় প্রশ্ন উঠেছে— কেন এই বিলম্ব? প্রকৃতপক্ষে যতদিন রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তিনি এই বিষয়টি সামনে আনেননি। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দু’মাস পরেই ২১ জুলাইয়ের প্রাক্কালে এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনলেন।
১৯৯৩ সালে এই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি। রাজ্যে আইনের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অভিযোগে সেদিন মহাকরণ অভিযানের দাবি ছিল, রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করতে হবে। সেই দাবির পথে যে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় জুড়ে আছে, তা আজও বেদনাদায়ক।
কমিশনের রিপোর্টে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই এই মৃত্যুগুলি ঘটেছে। কিছু আইপিএস আধিকারিকের নামও রিপোর্টে উঠে এসেছে। তবে তৎকালীন কলকাতা পুলিশের কমিশনার তুষার তালুকদার দাবি করেছিলেন, তিনি গুলি চালানোর নির্দেশ দেননি। আবার সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কমিশনকে জানিয়েছিলেন, বিচারবিভাগীয় তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত ছিল যৌথভাবে নেওয়া।
এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল— কেন তৎকালীন প্রধান সাক্ষী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে কমিশনের সামনে হাজির হননি? এই প্রশ্ন তুলেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও আহত হয়েছিলেন, এবং ঘটনাটি নিয়ে তাঁর অবস্থান বহুবার স্পষ্ট হয়েছে। অভিযোগ, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে মণীশ গুপ্ত নাকি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মণীশ গুপ্ত মমতা সরকারের মন্ত্রী এবং তারও পরে রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হন।
এখন প্রশ্ন হল, এই রিপোর্ট সামনে আসার ফলে কী পরিবর্তন হতে পারে? মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, নিহতদের পরিবার চাইলে নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে পারবেন এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি মানবিক পদক্ষেপ।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনীতি নতুন নয়। ২১ জুলাই দিনটি বহু বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করেছে। বড় সমাবেশ, রাজনৈতিক বার্তা— সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ। কিন্তু আজ সেই একই ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসছে। একসময়ের প্রতিবাদের প্রতীক আজ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের হাতিয়ার হয়ে উঠছে— এটাই বাস্তব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইতিহাসকে আমরা কীভাবে দেখি। ২১ জুলাইয়ের ঘটনা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলে ধরে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদ করার অধিকার মৌলিক। সেই অধিকার রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সেখানে গুলিচালনা— তা যেকোনও পরিস্থিতিতেই গুরুতর বিষয়।
আজ যখন আমরা এই ঘটনাকে ফিরে দেখি, তখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। কে দোষী, কে নির্দোষ— তা বিচারব্যবস্থা ঠিক করবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়কে ব্যবহার করা হলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়।
২১ জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ করা মানে শুধুমাত্র অতীতকে মনে রাখা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া। ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় যেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থাকে— বরং তা হোক গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রেরণা।




