বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক তিনি। অতিরিক্ত সময়ে তাঁর বাঁ পায়ের দুরন্ত গোলে স্পেনের হাতে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। কিন্তু হয়তো অনেকেরই মনে আছে, বিশ্ব ফুটবলের এই নতুন নায়কের সঙ্গে অনেক আগেই পরিচয় হয়েছিল কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের।
রবিবার মাঝরাতে ফাইনালে ইতিহাস গড়ার ন’বছর আগেই, মাত্র ১৭ বছর বয়সে এ শহরের গর্ব যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন তোরেস। ২০১৭-য় ভারতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে স্পেন দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন ভ্যালেন্সিয়ার যুব অ্যাকাডেমির সেই কিশোর ফুটবলার। ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে খেলতে নেমে সেই বিশ্বকাপে দুটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। স্পেনের ফাইনালে ওঠার পিছনে তাঁর দুরন্ত পারফরম্যান্স ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কাছে ২-৫ গোলে হেরে রানার্স-আপ হয় তারা।
সে বার অ্যাটাকিং উইঙ্গার হিসেবে স্পেনের হয়ে খেলেছিলেন ফেরান তোরেস। নিজের গতি ও অসাধারণ কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বারবার গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। বিশেষ করে মালির বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর ৭১ মিনিটে করা গোলটি স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। কলকাতার আগে অবশ্য কোচি ও গুয়াহাটিতেও খেলেছিলেন তিনি। তবে কলকাতায় ফাইনালেই সেরা পারফরম্যান্স দেখান তিনি। যুবভারতীতে ৭৩ মিনিট মাঠে থাকার পর কোচের ডাকে মাঠ ছাড়েন।
ন’বছর পরে কিশোর থেকে তরুণ হয়ে ওঠা সেই ফেরান তোরেসই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের ত্রাতা হয়ে ওঠেন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটের মাথায় বাইলাইনের ভিতর থেকে দেওয়া নিকো উইলিয়ামসের ব্যাক পাস থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে জয়সূচক গোল করেন তোরেস। এই একমাত্র গোলেই লিওনেল মেসিদের হারিয়ে দ্বিতীয় বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
অথচ এক সময় বলা হত, বার্সেলোনায় তাঁর দিন ফুরিয়ে এসেছে। সমর্থকদের একাংশের কটাক্ষ, ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন, দলে জায়গা হারানোর আশঙ্কা— সব মিলিয়ে ফেরান তোরেস যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে রূপকথা লেখে। আর সেই রূপকথারই নায়ক হয়ে উঠলেন স্পেনের এই ফরোয়ার্ড।
কয়েক মাস আগেও বার্সেলোনায় তোরেসকে নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল তুঙ্গে। প্রথম একাদশে নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে তাঁর উপর আস্থা হারাননি। জাতীয় দলের জার্সিতে সুযোগ পেয়েই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিলেন তোরেস।
ফাইনালের পর ফিফার ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই গোলটা শুধু আমার নয়, শুধু আমার বা এখানে থাকা ২৬ জন ফুটবলারের জন্য নয়, স্পেনের ৪ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের জন্য। আমার বিশ্বাস, আজকের এই পরিণতি আগে থেকেই লেখা ছিল। জয়টা আমাদেরই প্রাপ্য ছিল। আমরা দেশের মানুষের থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে খেলছিলাম, কিন্তু মাঠে আমাদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছি, যাতে ওরা অনুভব করতে পারে যে আমরা যেন ওদের খুব কাছেই আছি।
প্রতিটি ফাইনালই কঠিন। আর প্রতিপক্ষে যখন লিওনেল মেসির মতো ফুটবলার থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা স্নায়ুচাপ কাজ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সব সময় নিজেদের দর্শনেই অটল থেকেছি ও নিজস্ব ফুটবলটাই খেলেছি। আজও আমরা সেটাই আবার প্রমাণ করেছি’।
তোরেসের এই গোল শুধু তাঁর দেশকে বিশ্বকাপ জেতায়নি, বদলে দিয়েছে তাঁর ফুটবল-জীবনের গল্পও। যে ফুটবলারকে অনেকেই ‘ফুরিয়ে গিয়েছে’ বলে মনে করেছিলেন, তিনিই বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক। সমালোচনার জবাব তিনি দিয়েছেন মাঠে, পায়ের জাদুতেই।
স্পেনের এই বিশ্বজয়ও এসেছে দলগত শক্তিতে। লামিনে ইয়ামাল, রদ্রি, নিকো উইলিয়ামস, পাও কুবার্সিদের সঙ্গে তোরেসও হয়ে উঠেছেন সেই সাফল্যের অন্যতম মুখ। তবে ফাইনালের রাত নিঃসন্দেহে তাঁরই। এই রাত তাঁকে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই করেনি, স্পেনের ফুটবল ইতিহাসেও স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
আজ ফেরান তোরেস ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার তারকা। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপও তাঁর ঝুলিতে। তবে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ করে কলকাতার মানুষদের কাছে এই সাফল্যের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, যে ফুটবলার আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে নায়ক, তাঁর উত্থানের প্রথম সাক্ষী ছিল এ শহরই।




