• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 18 July, 2026

Explained: রান্নার গ্যাসের ভর্তুকিতে বাড়তি দিতে হচ্ছে ৭০ হাজার কোটি, বড়সড় দাম বাড়ানোর পথেই কেন্দ্র?

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে দেশের এলপিজি ভর্তুকি বিল ছাড়াতে পারে ১ লক্ষ কোটি টাকা, বাজেট বরাদ্দের তুলনায় বাড়তি ৭০ হাজার কোটির। উজ্জ্বলা যোজনায় কাটছাঁট, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সংযোগ প্রকল্প ও কলকাতার গ্যাসের দাম নিয়ে বিশদে।

Explained: রান্নার গ্যাসের ভর্তুকিতে বাড়তি দিতে হচ্ছে ৭০ হাজার কোটি, বড়সড় দাম বাড়ানোর পথেই কেন্দ্র?

গ্যাসের দাম বাড়তে চলেছে (AI নির্মাণ)

বাজেটের খাতায় যা ধরা ছিল, বাস্তবের অঙ্ক তার থেকে অনেকটাই বেশি। রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি বাবদ কেন্দ্রের হিসেব এমনই এক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে, যা নিয়ে এখন আর্থিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।পশ্চিম এশিয়ার সংকট এখনই মেটার কোনও সম্ভাবনা নেই। এই পরিস্থিতিতে খুব শিগগিরি গ্যাসের দাম একলাফে বাড়বে বলেই আশঙ্কা।

ভর্তুকির খাতা

আর্থিক পরামর্শদাতা সংস্থা পিএল ক্যাপিটালের (PL Capital) একটি রিপোর্ট বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে (FY27) দেশের এলপিজি ভর্তুকির (LPG Subsidy) খাতে খরচ ছাড়িয়ে যেতে পারে ১ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ কেন্দ্রীয় বাজেটে (Union Budget) এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বরাদ্দ আর বাস্তব খরচের মধ্যে ফাঁক দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার। সংস্থাটির হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিটি সিলিন্ডারে কেন্দ্র ও তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে (Oil Marketing Companies) প্রায় ৪৯০ টাকা করে পকেট থেকে খরচ করতে হচ্ছে, যার জেরেই বরাদ্দ এত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের আঁচ

এই পরিস্থিতির পিছনে বড় কারণ পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও জ্বালানির দাম বেড়েছে যথেষ্ট। সেই বাড়তি বোঝার বড় অংশ এখনও পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘাড়ে না চাপিয়ে কেন্দ্র ও তেল সংস্থাগুলিই নিজেদের কাঁধে রেখেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজকোষে।

আরও পড়ুন: হরমুজ়ে মাইন বিস্ফোরণে ২টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংসের দাবি ইরানের, অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের

খাদ্য-সারেও বাড়ছে বোঝা

শুধু গ্যাস নয়, সার্বিক ভর্তুকির অঙ্কেই টান পড়েছে। চলতি অর্থবর্ষের এপ্রিল-মে মাসে ভর্তুকি খাতে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বৃদ্ধির হার ৪৭ শতাংশ। খাদ্য খাতে ভর্তুকি (Food Subsidy) বেড়ে হয়েছে ৪০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, আগের বছরের ২৭ হাজার ৯৯০ কোটির তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ইউরিয়াতে ভর্তুকির (Urea Subsidy) বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫০ শতাংশ, অঙ্কের হিসেবে ২৮ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অন্য জৈব সারের ভর্তুকিও (Nutrient-Based Fertiliser Subsidy) বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।

উজ্জ্বলায় কাটছাঁট

ভর্তুকির বোঝা সামলাতে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনায় (Pradhan Mantri Ujjwala Yojana) কাটছাঁট শুরু করেছে। চলতি অর্থবর্ষ থেকে বছরে ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডারের সংখ্যা ৯ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৪টি। প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ টাকা ভর্তুকি মিলবে ঠিকই, তবে তা বছরে প্রথম চারটি রিফিলের জন্যই, অর্থাৎ পরিবারপিছু সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকার সুবিধা। এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন গ্রামীণ ও গরিব প্রান্তিক পরিবারগুলি, যাঁদের বছরের বাকি সময়টা বাজারদরেই সিলিন্ডার কিনতে হবে।

যদিও এই কেন্দ্রীয় কাটছাঁটের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্য সরকার সম্প্রতি দুর্গাপুরের একটি প্রশাসনিক বৈঠক থেকে ঘোষণা করেছে, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম ও পুরুলিয়া জেলার প্রায় ১৫ লক্ষ আটকে থাকা উপভোক্তাকে উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় নিখরচায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ একদিকে কেন্দ্র ভর্তুকির অঙ্ক ছাঁটছে, অন্যদিকে রাজ্য নতুন সংযোগের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

কলকাতার হেঁশেলের হিসেব

জুলাইয়ের শুরুতে অবশ্য সাময়িক স্বস্তি মিলেছে কলকাতায়। বাণিজ্যিক ১৯ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ২৫৫ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮১ টাকায়। তবে ঘরোয়া ১৪.২ কেজির সিলিন্ডারের দর অপরিবর্তিতই থেকেছে, বুকিং করলে খরচ পড়ছে প্রায় ৯৬৮ টাকা। দিল্লির তুলনায় যা কিছুটা বেশি, পরিবহণ খরচের কারণে যা স্বাভাবিক। ভর্তুকির অঙ্ক কেন্দ্রীয়ভাবে যতই কমুক, শহরের মানুষের পকেটে তার আঁচ কতটা পড়বে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

আগামী দিনের পথ

পিএল ক্যাপিটালের রিপোর্ট বলছে, রাজকোষ ঘাটতি (Fiscal Deficit) নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথমার্ধে কেন্দ্রের অগ্রাধিকার থাকতে চলেছে, বাড়তি ঋণের পথে হাঁটার বদলে। মূলধনী ব্যয়ও (Capital Expenditure) বেড়েছে ঠিকই, মে মাস পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকায়, ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে গত বছরের প্রথমার্ধে মূলধনী ব্যয় আগেভাগেই খরচ করে ফেলা হয়েছিল বলে সেই তুলনাটা কিছুটা উঁচু ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ যত বাড়বে, পরিকাঠামো খাতে খরচের গতি ততটাই রাশ টানা থাকার সম্ভাবনা। আর সামগ্রিকতার নিরিখে, চাপ সামলাতে গ্যাসের দামা বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।