বিশ্বরাজনীতির উত্তপ্ত মানচিত্রে একটি উপসাগরীয় জলপথ এখন কেন্দ্রে— হরমুজ প্রণালী। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার উপর দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়, এখন শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক করিডর নয়; এটি পরিণত হয়েছে শক্তির রাজনীতির এক বিস্ফোরক মঞ্চে। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাত এই প্রণালীকে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছে এবং সেই সঙ্গে উন্মোচিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক কূটনীতি।
গত কয়েক দিনে যে ঘটনাগুলি ঘটেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বিপজ্জনকও। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল হঠাৎ কমে গেছে; জাহাজগুলি ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাচ্ছে; এমনকি কিছু জাহাজ বিকল্প পথে পণ্য স্থানান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে ইরান দাবি করেছে যে তারা প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা বলছে— তারা এই পথের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিচ্ছে।
এই পরস্পরবিরোধী দাবি আসলে যে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার ছবি তুলে ধরছে, তা হলো— হরমুজ আজ আর আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, বরং ক্ষমতার প্রদর্শনের ক্ষেত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলা, ইরানের জাহাজে আক্রমণ, পাল্টা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে একটি সামান্য ভুল পদক্ষেপও বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
কিন্তু এই উত্তেজনার কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই স্থিতিশীলতা চাইছে, নাকি নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে এক সচেতন অস্থিরতা তৈরি করছে?
ওয়াশিংটনের বক্তব্য, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে, তা হল সামরিক শক্তির মাধ্যমে একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ইরান যদি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হয়ে প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কেন একইভাবে আইনসম্মত সীমার মধ্যে থাকে না? কেন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের নামে বারবার সামরিক হামলা চালানো হয়?এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। পশ্চিম এশিয়ায় তাদের উপস্থিতি কখনওই নিরপেক্ষ ছিল না। তেল, বাণিজ্যিক পথ, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব— এই তিনটি উপাদানই ওয়াশিংটনের নীতির কেন্দ্রে। হরমুজ প্রণালী সেই তিনটির মিলনবিন্দু। ফলে এখানে ‘নিরাপত্তা’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রণ’-ই আসল লক্ষ্য— এ কথা বলা অমূলক নয়।
২০২৬ সালের এই সংকটের পটভূমিও তা-ই নির্দেশ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার পর ইরান প্রণালী বন্ধ করে দেয়, জাহাজে আক্রমণ শুরু হয়, তারপর মার্কিন নৌ অবরোধ এবং পাল্টা হামলা— সব মিলিয়ে এক ক্রমবর্ধমান সংঘাতের চক্র তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নীতিমালা, সমুদ্র আইন— সবই যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মতো করে নিয়ম তৈরি করছে এবং প্রয়োগ করছে। ফলে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলির কাছে প্রশ্ন জাগছে— এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তাদের নিরাপত্তা কোথায়?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ভারত।
ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালী শুধুমাত্র একটি দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ তেল আমদানি এই পথ দিয়ে আসে। ফলে হরমুজে কোনও অস্থিরতা মানেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন। সাম্প্রতিক ঘটনায় ভারতীয় নাবিকদের উপর আক্রমণের ঘটনাও এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এখানেই ভারতের দোটানা সবচেয়ে প্রকট। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার— বিশেষত চিনের মোকাবিলায়। অন্যদিকে, ইরান ভারতের জন্য শুধু জ্বালানি উৎস নয়; এটি মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সেতু।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। যদি ভারত মার্কিন অবস্থানকে নিঃশর্ত সমর্থন করে, তবে তা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বৃহত্তর অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করবে। আবার যদি ভারত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকে বা মার্কিন নীতির সমালোচনা করে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই ভারতের সামনে যে পথ, তা সরল নয়— বরং সূক্ষ্ম, বহুস্তরীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রথমত, ভারতকে তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, কোনও শক্তির ছায়াতলে নয়, বরং নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। হরমুজের ক্ষেত্রে এর অর্থ— আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে প্রণালীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া, কিন্তু কোনও এক পক্ষের সামরিক অভিযানে সরাসরি সমর্থন না করা।
দ্বিতীয়ত, ভারতকে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে। কারণ, হরমুজের মতো একটি ‘চোকপয়েন্ট’-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সংকট আবার সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তৃতীয়ত, ভারত নিজেকে একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগও বিবেচনা করতে পারে। ইতিহাস বলছে, ভারত বহুবার আন্তর্জাতিক সংকটে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। হরমুজ সংকটেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু সবশেষে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— ভারত কি এই সংকটকে শুধুমাত্র একটি ‘ঝুঁকি’ হিসেবে দেখবে, নাকি একটি ‘সুযোগ’ হিসেবেও বিবেচনা করবে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আক্রমণাত্মক ভূমিকা বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই সংকটে যে দেশগুলি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে। ভারত যদি সত্যিই একটি আন্তর্জাতিক শক্তি হতে চায়, তবে তাকে এই কঠিন প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে হবে এবং তা শুধুমাত্র কূটনৈতিক ভাষায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেও।




