ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির যুগে আমরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই-এর ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বিচারব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এর সীমা কোথায় হওয়া উচিত— এই প্রশ্ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে বলেছেন, এআই কখনও বিচারক হতে পারে না, এটি কেবল সহায়ক হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে গভীর বাস্তবতা। কারণ বিচারব্যবস্থা শুধু আইন বা তথ্যের ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানবিকতা, নৈতিকতা, বিচারবুদ্ধি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যা কোনও যন্ত্রের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে অনুকরণ করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যা এআই ব্যবহারের ঝুঁকি স্পষ্ট করে দেয়। একটি ট্রাইব্যুনাল নাকি এআই-এর তৈরি ভুয়ো রায়ের ওপর নির্ভর করে একটি বাস্তব মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ এআই অনেক সময় এমন তথ্য তৈরি করে, যা বাস্তবে অস্তিত্বই নেই— যাকে বলা হয় ‘হ্যালুসিনেশন’। বিচারব্যবস্থায় যদি এই ধরনের ভুল তথ্য ঢুকে পড়ে, তাহলে তার ফল হতে পারে ভয়াবহ।
শুধু তাই নয়, আদালতে দাখিল করা কিছু নথিতেও দেখা গিয়েছে, এআই এমন কিছু মামলার নাম উল্লেখ করেছে, যেগুলি বাস্তবে কখনও ছিলই না। ‘মার্সি ভার্সেস ম্যানকাইন্ড’ নামের একটি কাল্পনিক মামলার উল্লেখ তারই উদাহরণ। এই ধরনের ভুল তথ্য বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এআই-এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করার কথাও প্রধান বিচারপতি বলেননি। তিনি স্বীকার করেছেন, এআই ইতিমধ্যেই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এবং একে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন এর সঠিক ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। যেমন— মামলার প্রাথমিক বাছাই করা, নথিপত্র সাজানো, অনুবাদের খসড়া তৈরি করা— এইসব ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এআই নিজে থেকে বিচার করতে শুরু করে— অর্থাৎ কে ঠিক, কে ভুল, কার দাবি বেশি শক্তিশালী— এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে। বিচারপতির ভাষায়, এই মুহূর্তেই এআই তার সীমা অতিক্রম করে। কারণ বিচার করা মানে কেবল তথ্য বিশ্লেষণ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের প্রয়োগ। আর এই কাজের জন্য মানুষের বিচারবোধের কোনও বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি।
এখানেই উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— মানবিক তদারকি। এআই যতই উন্নত হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষের নজরদারি ছাড়া এর ব্যবহার নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যাঁরা প্রযুক্তি সম্পর্কে কম জানেন, তাঁদের জন্য এআই-এর ভুল তথ্য আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে আইনগত কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে এআই-এর ব্যবহার মানুষের উপকারে আসে, ক্ষতি না করে।
বিচারব্যবস্থা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত কারও জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখানে কোনও ধরনের ‘শর্টকাট’ বা অন্ধ নির্ভরতা চলতে পারে না। প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না— এই মৌলিক সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না।
সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, বিচারব্যবস্থায় এর ভূমিকা স্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এআই হবে সহায়ক, কিন্তু বিচারক নয়— এই নীতি মেনে চলাই ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য সবচেয়ে জরুরি।




