মাস কয়েক আগেই যে তরুণ প্রজন্মের ভোটে ক্ষমতায় এসেছিলেন বালেন্দ্র শাহ, এবার তাঁর সরকারের বিরুদ্ধেই রাস্তায় নামল সেই জেন জি (Gen Z)। কাঠমান্ডুর রাস্তায় ফের প্রতিবাদের ঢেউ। তবে এবার বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে দুর্নীতি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞার কারণে নয়, বরং একটি উচ্ছেদ অভিযানের জেরে।
বিতর্কের সূত্রপাত
এপ্রিল মাস থেকে কাঠমান্ডু উপত্যকার বাগমতী নদী ও তার আশপাশের এলাকায় বেআইনি বসতি সরানোর অভিযান শুরু করে নেপাল সরকার। এই অভিযানে আড়াই হাজারের বেশি পরিবার, অর্থাৎ প্রায় পনেরো হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। প্রশাসনের দাবি, নদীর ধারে বেআইনি দখলদারি সরিয়ে বন্যার ঝুঁকি কমানো ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধারই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু ক্ষোভের মূল কারণ নীতি নয়, বাস্তবায়নের পদ্ধতি। আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ। প্রায় সাড়ে তিনশো পরিবারকে অস্থায়ী শিবিরে ঠাঁই দেওয়া হলেও বর্ষার জলে সেই শিবিরও প্লাবিত হয়ে পড়ে, বিশেষত কীর্তিপুরে।
🚨 #NewsAlert | Nepal youth protests intensify as Gen Z launches agitation against government.#NepalProtest | #GenZ | #YouthMovement | #NepalPolitics | #GovernmentProtest | #SouthAsia | #UNI pic.twitter.com/3g6I9N85TO
— United News of India (@uniindianews) July 12, 2026
আত্মহননের ঘটনা
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পুরসভার কর্মীদের সঙ্গে বচসার জেরে গণেশ নেপালি নামে এক গাড়িচালক নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেন। কয়েকদিনের মধ্যে আরও দু’-একটি আত্মহননের চেষ্টার খবরও প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনাগুলি প্রতিবাদীদের কাছে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। জয়েন্ট ন্যাশনাল স্কোয়াটার্স ফ্রন্ট (Joint National Squatters Front)-এর ব্যানারে শনিবার কাঠমান্ডুর মৈতীঘর মণ্ডলায় শয়ে শয়ে তরুণ-তরুণী জড়ো হয়ে দরিদ্রদের উপর অত্যাচার বন্ধের দাবি তোলেন।
আদালতের হস্তক্ষেপ
নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে একাধিকবার এই উচ্ছেদ অভিযানে হস্তক্ষেপ করেছে। মে মাসে আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা না করে কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। নির্দেশ দেওয়া হয়, ইতিমধ্যে গৃহহীন হওয়া পরিবারগুলির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও একাধিকবার একই আর্জি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ অবশ্য তাঁর সরকারের পদক্ষেপকে আইনসম্মত বলেই দাবি করেছেন। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতি ছড়াচ্ছে। তবে কয়েকজন তরুণ আন্দোলনকারীকে আটক ও হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
যে বিপ্লব বালেনকে ক্ষমতায় এনেছিল
এই প্রতিবাদের তাৎপর্য বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে রাস্তায় নামে নেপালের তরুণ প্রজন্ম। যা দ্রুত পরিণত হয় সরকার-বিরোধী গণআন্দোলনে। সেই আন্দোলনে প্রাণ হারান প্রায় ৭৫ জন, পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। এরপর চলতি বছরের মার্চে হওয়া নির্বাচনে কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র, র্যাপার-ইঞ্জিনিয়ার বালেন্দ্র শাহের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (Rastriya Swatantra Party) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন তিনি, তরুণ প্রজন্মের কাছে যিনি ছিলেন পুরনো রাজনীতির বিকল্প মুখ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মাথাতেই সেই তরুণ প্রজন্মেরই একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।
কেন এই খবর গুরুত্বপূর্ণ
নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ বরাবরই সবচেয়ে আগে টের পায় পশ্চিমবঙ্গ। কারণ দার্জিলিং জেলার পানিটাঙ্কিই ভারত-নেপাল সীমান্তের পূর্বতম ও সবচেয়ে ব্যস্ত প্রবেশপথ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও শয়ে শয়ে পণ্যবাহী গাড়ি এই সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের বড় আন্দোলনের সময় এই সীমান্তে যান চলাচল কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বহু ভারতীয় নাগরিক আটকে পড়েছিলেন কাঠমান্ডুতে, সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-কে বাড়তি সতর্কতা জারি করতে হয়েছিল দার্জিলিঙে। বর্তমান প্রতিবাদ এখনও পর্যন্ত সেই মাত্রায় পৌঁছয়নি এবং সীমান্তে কোনও বিপর্যয়ের খবর মেলেনি, তবে দার্জিলিং-কালিম্পঙের গোর্খা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নেপালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগ এবং শিলিগুড়ি হয়ে নেপাল বাণিজ্যের উপর নির্ভরতার কারণে এই ধরনের যে কোনও অস্থিরতাতেই বাংলার জন্য উদ্বেগের।




