প্রায় দেড় দশক পর দেশে শুরু হতে চলেছে জনগণনা। ২০১১ সালের পর এই প্রথম জাতীয় জনগণনার কাজ শুরু হচ্ছে। ২০২১ সালে জনগণনা হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। এবার জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ২০২৭-এর সেন্সাসের।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গণনাকারীদের প্রশিক্ষণ চলছে।তাঁদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ, সেলফ্-এনুমারেশন প্রক্রিয়া এবং বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রসঙ্গত, নিজের পরিবারের জনগণনার ফর্ম নিজেই অনলাইনে পূরণ করার পদ্ধতিকে সেলফ-এনুমারেশন বলা হয়।
আগস্ট মাসে শুরু হবে জনগণনার প্রথম পর্ব, যা ‘হাউস লিস্টিং অ্যান্ড হাউজিং অপারেশন’ নামে পরিচিত। এই পর্বে বাসস্থানের অবস্থা, মৌলিক সুযোগ-সুবিধে এবং পরিবারের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। সরকারি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করবেন গণনাকারীরা। পাশাপাশি নাগরিকরাও নির্দিষ্ট সেলফ্-এনুমারেশন পোর্টালে অনলাইনে নিজেদের তথ্য জমা দিতে পারবেন।
প্রথম পর্বের কাজ হবে দুই ধাপে। ১ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত চলবে সেলফ-এনুমারেশন। এই সময়ের মধ্যে নিজেরাই পোর্টালে তথ্য পূরণ করতে পারবে। ফর্ম পূরণ শেষে মোবাইলে ওটিপি পাঠিয়ে তথ্য যাচাই করা হবে। গণনাকারীরা প্রয়োজন হলে এই কাজে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করবেন।
এরপর ১৬ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গণনাকারীরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে অনলাইনে জমা দেওয়া তথ্য যাচাই করবেন। একই সঙ্গে এলাকার বাড়ি ও পরিবারের সংখ্যা, অবস্থান এবং স্যাটেলাইট ম্যাপের সাহায্যে ম্যাপিংয়ের কাজও করবেন। একজন গণনাকারীকে গড়ে ১৫০ থেকে ১৮০টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
প্রথম পর্বে মোট ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নগুলি মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত।
প্রথমত, বাড়ির পরিচয় ও কাঠামো। এর মধ্যে থাকবে বাড়ি ও জনগণনার নম্বর, মেঝে, দেওয়াল ও ছাদের প্রধান উপাদান, বাড়ির ব্যবহার, বর্তমান অবস্থা, মালিকানার ধরন, পরিবারের সংখ্যা, নিয়মিত বসবাসকারী সদস্যদের সংখ্যা, পরিবারের প্রধানের নাম, লিঙ্গ ও তিনি তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত কি না। এছাড়াও বসবাসযোগ্য ঘরের সংখ্যা এবং পরিবারে কতজন বিবাহিত দম্পতি রয়েছেন তাও জানতে চাওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত থাকবে মৌলিক সুযোগ-সুবিধে। পানীয় জলের প্রধান উৎস ও তার অবস্থান, বিদ্যুতের উৎস, শৌচাগার রয়েছে কি না এবং তার ধরন, জলনিকাশী ব্যবস্থা, বাড়িতে স্নানের জায়গা, রান্নাঘর ও এলপিজি বা পিএনজি সংযোগ এবং রান্নার প্রধান জ্বালানি সম্পর্কে তথ্য দিতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবারের সম্পদ ও ডিজিটাল সুযোগ সুবিধে সংক্রান্ত তথ্য। রেডিও, ট্রানজিস্টর, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, টেলিফোন, মোবাইল বা স্মার্টফোন রয়েছে কি না, সাইকেল, স্কুটার, মোটরসাইকেল, মোপেড, চারচাকার গাড়ি, জিপ বা ভ্যানের মালিকানা আছে কি না তা জানাতে হবে। এছাড়াও পরিবারে প্রধান খাদ্যশস্য কী। দিতে হবে একটি মোবাইল নম্বরও। এই নম্বর শুধুমাত্র জনগণনা-সংক্রান্ত যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের পুরুষ ও মহিলার সংখ্যা, তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন কি না সেই সম্পর্কেও তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। বাড়ির মেঝে, ছাদ বা দেওয়ালের ধরন সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হবে জনগণনার দ্বিতীয় বা পপুলেশন এনুমারেশন পর্ব। সেই সময়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের বিস্তারিত জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এই পর্বে জাত বা কাস্টভিত্তিক তথ্যও নেওয়া হবে। তবে দ্বিতীয় পর্বে ঠিক কী কী প্রশ্ন থাকবে, তার চূড়ান্ত তালিকা এখনও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারের মতে, জনগণনার উদ্দেশ্য শুধু দেশের জনসংখ্যা গণনা নয়। মানুষের জীবনযাত্রা, আবাসন, পানীয় জল এবং অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর বাস্তব ছবি তুলে ধরা। এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হবে।