• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 9 July, 2026

Explained: মোবাইল-ল্যাপটপ কি সস্তা হচ্ছে? বিদেশি যন্ত্রাংশে শুল্ক মকুব কেন্দ্রের, বড় সুযোগ বাংলারও

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, ডিসপ্লে অ্যাসেম্বলি ও ইনডাক্টর কয়েলের যন্ত্রাংশে শুল্ক মকুব করল কেন্দ্র। নৈহাটি, ফলতা ও দুর্গাপুরকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের ইলেকট্রনিক্স স্বপ্নে কতটা প্রভাব পড়বে, বিশদ বিশ্লেষণ।

Explained: মোবাইল-ল্যাপটপ কি সস্তা হচ্ছে? বিদেশি যন্ত্রাংশে শুল্ক মকুব কেন্দ্রের, বড় সুযোগ বাংলারও

দাম কমবে ল্যাপটপ-মোবাইলের (AI নির্মাণ)

দেশে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পকে চাঙ্গা করতে বড়সড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (lithium-ion battery), ডিসপ্লে অ্যাসেম্বলি (display assembly) এবং ইনডাক্টর কয়েল মডিউল (inductor coil module) তৈরিতে ব্যবহৃত একাধিক জরুরি যন্ত্রাংশে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। বুধবার জারি হওয়া এই বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হয়ে গিয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই, এবং তা বলবৎ থাকবে ২০২৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত।

ঠিক কী ঘোষণা

কেন্দ্রীয় পরোক্ষ কর ও শুল্ক পর্ষদের (Central Board of Indirect Taxes and Customs বা CBIC) জারি করা এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশীয় উৎপাদন সংস্থাগুলি যাতে সস্তায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারে, তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। সরকারের প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেন্টিভ (Production Linked Incentive বা PLI) প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচ এবং স্মার্ট টিভির মতো ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির খরচ কমিয়ে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বড় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

ব্যাটারি থেকে ডিসপ্লে, ছাড় কোন কোন যন্ত্রাংশে

শুল্কমুক্ত তালিকায় রয়েছে ন্যানো-ক্রিস্টালাইন অ্যাসেম্বলি, ই-শিল্ড, পিইটি লাইনার, পিসি সিম, কয়েল এবং নিওডিমিয়াম আয়রন বোরন বা এনডিএফইবি (NdFeB) চুম্বক। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় ৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশই এখন শুল্কমুক্ত হয়ে গেল, যা সংখ্যার বিচারে সত্যিই বিরাট বদল। CBIC প্রতিটি যন্ত্রাংশের প্রযুক্তিগত সংজ্ঞাও স্পষ্ট করে দিয়েছে, যাতে বন্দরে বন্দরে আমদানিকারীদের বিভ্রান্তি বা হয়রানির শিকার হতে না হয়।

শেয়ার বাজারে প্রভাব

এই ঘোষণার পরপরই শেয়ার বাজারে ইলেকট্রনিক ম্যানুফ্যাকচারিং সার্ভিসেস বা ইএমএস (EMS) সংস্থাগুলির শেয়ারে চাঙ্গা ভাব দেখা গিয়েছে। ডিক্সন টেকনোলজিস (Dixon Technologies) ও কেইনস টেকনোলজি (Kaynes Technology)-র মতো সংস্থার শেয়ারে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি লক্ষ করা গিয়েছে। ব্যাটারি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির মধ্যে আমারা রাজা এনার্জি অ্যান্ড মোবিলিটি (Amara Raja Energy and Mobility), এইচবিএল ইঞ্জিনিয়ার (HBL Engineer) এবং রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (Reliance Industries)-এর শেয়ারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মিন্ডা কর্পোরেশন (Minda Corporation) ও হিমাদ্রি স্পেশ্যালিটি কেমিক্যালের (Himadri Speciality Chemical) মতো যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সংস্থাগুলিও লাভবান হয়েছে বলে বাজার সূত্রে জানা যাচ্ছে।

মোবাইল-ল্যাপটপ কি সত্যিই সস্তা

উৎপাদন খরচ কমলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি বাজারে মোবাইল বা ল্যাপটপের দামও কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কারণ, কম দামে যন্ত্রাংশ পেলে সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচ কমবে। তবে সেই সুবিধা ক্রেতার হাত পর্যন্ত কতটা পৌঁছবে, তা নির্ভর করছে প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব খরচ কাঠামো এবং বাজারের প্রতিযোগিতার উপর। অর্থাৎ দাম কমা নিশ্চিত না হলেও, এই শুল্ক ছাড় দেশীয় উৎপাদনের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে, এটুকু বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বাংলার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে আলাদা করে দেখার মতো। গত ২২ জুন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় যে বাজেট পেশ করেছিলেন, তাতে ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর সংক্রান্ত উৎপাদন, হার্ডওয়্যার যন্ত্রাংশ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো অগ্রাধিকারভুক্ত ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার কোটি টাকার শিল্প উৎসাহ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে বড় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্প থেকে দূরে থাকা বাংলা এবার সেই ঘাটতি পূরণে মরিয়া, আর কেন্দ্রের এই শুল্ক ছাড় সেই লক্ষ্যে অক্সিজেন জোগাতে পারে বলেই মনে করছেন শিল্পমহলের একাংশ।

ফলতা থেকে দুর্গাপুর, রাজ্যের পরিকল্পনা

রাজ্য সরকার কেন্দ্রের মডিফায়েড ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ক্লাস্টার্স বা ইএমসি ২.০ (EMC 2.0) প্রকল্পের সহায়তায় উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি (৭০ একর) এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা (৫৮ একর) ইলেকট্রনিক্স ক্লাস্টার দু’টির পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। কলকাতা, বন্দর এবং প্রধান লজিস্টিক নেটওয়ার্কের কাছাকাছি হওয়ায় এই দুই ক্লাস্টারকেই রাজ্যের মূল ভরসাকেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া দুর্গাপুর অঞ্চলে একটি সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট গড়ে তোলার প্রস্তাবও রাজ্যের শিল্পনীতিতে জায়গা পেয়েছে। যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমে গেলে এই ধরনের নতুন উৎপাদন ইউনিটের প্রাথমিক লগ্নির খরচও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা রাজ্যের বিনিয়োগ টানার লড়াইয়ে সহায়ক হতে পারে।

সতর্কতা

মনে রাখা দরকার, এই শুল্ক ছাড় সরাসরি সাধারণ ক্রেতার জন্য নয়, বরং কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের জন্য। বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আনা মোবাইল, ল্যাপটপের উপর প্রযোজ্য শুল্ক ও ব্যাগেজ নিয়ম আলাদা, এবং তাতে কোনও বদল হয়নি।