সংবাদ মাধ্যমে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়, কিন্তু রাজ্য স্তরের রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলি (SPSEs) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনসমক্ষে পর্যালোচনার রাডারের বাইরে থেকে যায়। প্রায় সমস্ত রাজ্যের ক্ষেত্রেই SPSE-গুলি একই রকম হতাশাজনক পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে, এবং প্রায়শই তাদের অস্তিত্বের কোনও যৌক্তিকতা দেখা যায় না। লোভী আমলা ও রাজনীতিবিদদের হাতে এগুলি অসহায় দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রাজ্যের বিপুল সম্পদ গ্রাস করেও খুব সামান্যই পরিষেবা এবং রাজ্যের বিনিয়গের প্রতিদান প্রদান করে। পূর্ববর্তী ফাইনান্স কমিশনগুলো বারবার এদের হতাশাজনক পরিস্থিতিকে কটাক্ষ করে তাদের জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু তাদের সমস্ত সুপারিশই বিফলে গিয়েছে। SPSE-গুলির ক্ষেত্রে তথ্যের একমাত্র উৎস হল ক্যাগ (CAG) রিপোর্ট, কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস সরকার সমস্ত সাংবিধানিক রীতিনীতি চরমভাবে উপেক্ষা করে ২০২১ সাল থেকে বিধানসভায় কোনও ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করেনি, যা ছাড়া এগুলি জনসাধারণের সামনে উপস্থাপিত করা সম্ভব নয়। তাই, ২০২১-এর পর থেকে থেকে আমরা এদের আর্থিক অবস্থা, লাভ-লোকসান ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত নই। বাজেটে দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে, কেননা সেগুলো ক্যাগ-নিরীক্ষিত নয়।
৩১ মার্চ ২০২১ সাল পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গে ৮টি বিধিবদ্ধ কর্পোরেশন-সহ ৮৫টি SPSE ছিল; এর মধ্যে ১৯টি অকার্যকর ছিল এবং কিছুই উৎপাদন করত না। SPSE-গুলি বিদ্যুৎ, পরিকাঠামো, অর্থ, উৎপাদন, পরিষেবা, কৃষি, কল্যাণ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৬টি কর্মরত SPSE-র লেনদেন ছিল ৫৪,৫২২ কোটি টাকা, যা রাজ্যের জিডিপি-র (GSDP) ৪.২%; এর প্রায় ৮০% এসেছে মাত্র তিনটি SPSE থেকে: ডব্লুএসইডিসিএল (৪০%), ডব্লুবিএসবিসিএল (২৪%) এবং ডব্লুবিপিডিসিএল (১৬%)। SPSE-গুলির হিসাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ কয়েক বছর ধরে বকেয়া পড়ে রয়েছে, মাত্র ২৩টি SPSE-র হিসাব হালনাগাদ করা আছে। তাদের সর্বশেষ চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ অর্থবছরে মাত্র ৩৩টি SPSE লাভজনক ছিল; তারা মোট ৬৯২ কোটি টাকা লাভ করেছে; বাকি অর্ধেক, মানে ৩৩টি কর্মরত SPSE সেই বছরে মোট ১০৬০ কোটি টাকা লোকসানের কথা জানিয়েছে। লোকসানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল পরিবহণ সেক্টর: ডব্লুবিএসইডিসিএল (১৯০ কোটি টাকা), সিএসটিসি (১৭৪ কোটি টাকা) এবং এসবিএসটিসি (৭৯ কোটি টাকা)। এছাড়া বিদ্যুৎ কোম্পানি দুর্গাপুর প্রজেক্টস লিমিটেড-এরও ১১৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
২০২১ অর্থবছরে রাজ্য সরকার SPSE-গুলোকে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার বাজেট সহায়তা প্রদান করেছে, যার বেশিরভাগই গিয়েছে পরিষেবা সেক্টর (৭৯৬ কোটি টাকা) এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোতে (৫৯৬ কোটি টাকা)। তাদের ওপর মোট ১৭,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ওপর রাজ্য এই বছরে মাত্র ৭৪ লক্ষ টাকা লভ্যাংশ অর্জন করেছে, যা এসেছে মাত্র ২টি কোম্পানি থেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ওয়্যারহাউস কর্পোরেশন এবং সরস্বতী প্রেস লিমিটেড। সরকারের কাছে SPSE-দের ঋণ ৭২০০ কোটি টাকারও বেশি। রাজ্যের মোট ৮৫টি SPSE-র মধ্যে ৪১টির পুঞ্জীভূত লোকসান তাদের মোট ইকুইটি মূলধনকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, যার ফলে তারা আর কোনোরূপ উৎপাদনে বা পরিসেবায় অক্ষম। এদের মধ্যে ২১টি উৎপাদন খাতে এবং ৮টি পরিষেবা খাতে রয়েছে। পরিবহন সংস্থাগুলি, সিএসটিসি এবং ডব্লুবিএসটি সিএল, আবার এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
বেশিরভাগ SPSE-রই অস্তিত্বের কোনও যৌক্তিকতা নেই। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন ডব্লুবিআইডিসি, যার কাজ হল শিল্পায়ন উন্নীত করে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন। এ ছাড়াও জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পগুলিকে জমি বরাদ্দ করা, পরিকাঠামো উন্নয়ন করার মাধ্যমে শিল্প বিনিয়োগ উন্নত করা, ইত্যাদি। গত অর্ধশতাব্দী ধরে, প্রথমে বাম শাসনামলে তাদের ‘ঘেরাও’ সংস্কৃতির পরিণতি হিসেবে এবং তারপর তৃণমূল কংগ্রেসের অধীনে সিঙ্গুর আন্দোলনের শিল্প-বিরোধী উত্তরাধিকার হিসেবে রাজ্য থেকে শিল্প ও বিনিয়োগ যেভাবে অবাধে পালিয়ে গেছে, তা বিবেচনা করলে এর অস্তিত্বের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। এর বেশিরভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়িত হতে পারেনি, আর জমি অধিগ্রহণের কথা না বলাই ভালো। এককথায়, একটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল সংস্থা। আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও অর্থ নিগম, পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণী উন্নয়ন ও অর্থ নিগম, পশ্চিমবঙ্গ তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি উন্নয়ন ও অর্থ নিগম ইত্যাদি, যেগুলি তৈরি হয়েছিল ব্যর্থ হওয়ার জন্য। এগুলিকে তথাকথিত ‘কল্যাণমূলক’ SPSE বলা হয়, যেগুলি শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্যদের ঋণ প্রদান করে এবং এই ঋণগুলি থেকে প্রাপ্ত সুদই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। প্রথাগতভাবে এই কাজগুলো ব্যাঙ্কগুলো অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে করে থাকে, কারণ প্রকল্প মূল্যায়নে তাদের যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা আছে, তা এই সংস্থাগুলির নেই এবং তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক আর্থিক সক্ষমতা ও পরিসরও রয়েছে। তাই ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে, তারা তাদের সামান্য মূলধন ফিক্সড ডিপোজিটে রাখে এবং তার থেকে সুদ অর্জন করে, যা তাদের মূল উদ্দেশ্যকেই বিফল করে দেয়। এছাড়াও রয়েছে অনেক উন্নয়ন কর্পোরেশন— যেমন গবাদি পশু, মৎস্য, বীজ, চা, হস্তচালিত তাঁত ও বিদ্যুৎচালিত তাঁত, চিনি ও চামড়া শিল্প, এমনকি চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও— বস্তুত, রাজ্য মনে করে যে, সম্ভাব্য প্রতিটি কার্যকলাপেই তার দক্ষতা রয়েছে একটি পাঠ্যপুস্তক কর্পোরেশনও রয়েছে যা স্কুলের পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ ও বিতরণ করে। তৃণমূল সরকারের আমলে এদের বর্ধিত ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারী পাঠ্যপুস্তক প্রকাশকদের প্রায় শেষ করে দিয়েছে।
এতগুলি SPSE বিস্তারের পেছনের আসল কারণটি অনুমান করা কঠিন নয়। সরকারের প্রতি তাদের প্রশ্নাতীত আনুগত্যের পুরস্কার স্বরূপ প্রায় সমস্ত SPSE-র উচ্চতম পদে রয়েছেন হয় অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিকরা, নয়ত যে সমস্ত বিধায়কদের মন্ত্রিত্বে অনুভুক্ত করা যায়নি তাঁরা। লোকসান-প্রবণ SPSE-গুলি তাদের মন্ত্রীদের মতো একই বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং বিশেষাধিকার প্রদান করে, যদিও তাতে তাদের আর্থিক অবস্থা আরও নিঃশেষিত হতে থাকে। সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলির সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জন্য জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা তাদের নিয়োগের জন্যে জরুরী নয়। দীর্ঘস্থায়ী শিল্প অসুস্থতায় বিপর্যস্ত একটি রাজ্যে শিল্প পুনরুজ্জীবনের নেতৃত্ব দেওয়া, বৃহত্তর সামাজিক উদ্দেশ্যগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করার জন্য SPSE-গুলির যে যৌক্তিকতা ছিল, তা এত মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে যে SPSE-গুলো আজ কেবল উপহাস আর বিদ্রূপ ছাড়া অন্য কিছুর অপেক্ষা রাখে না।
নতুন সরকার রাজ্যের জন্য এক নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজস্ব-বাস্তবতা আজ বিভিন্ন রাজ্যের SPSE-গুলির কাছ থেকে অনেক বেশি দক্ষতা এবং রাজ্যের কোষাগারে অর্থবহ অবদান দাবি করছে। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ SPSE নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পক্ষে অত্যন্ত অসুস্থ; সেগুলিকে বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং তাদের কর্মচারীদের সরকারি শূন্যপদ পূরণের জন্য পুনরায় মোতায়েন করা উচিত। রাজ্য যে কাজগুলি পরিচালনা করতে জানে না সেগুলি থেকে সরে এসে যে কাজটি তার করা উচিত, অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন এবং নীতি নির্ধারণ— তার ওপর মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।




